রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

এখন প্রয়োজন সামাজিক কৃষি

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:০০

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান কিছুটা কমে গেলেও এই খাতের সম্ভাবনার দিকটি কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। স্বাধীনত্তার পর বাংলাদেশে চাল উত্পাদন হতো ১ কোটি ১০ লাখ টন। বর্তমানে চালের উত্পাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৮৯ লাখ টনে। বর্ণিত সময়ে নানা কারণেই আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমেছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বেড়ে ১৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া কৃষি উত্পাদনের জন্য অত্যন্ত সহায়ক বা অনুকূল। এখানে খুব অল্প পরিশ্রমেই পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল উত্পাদন করা সম্ভব। কিন্তু কিছু কিছু সমস্যার কারণে কৃষি খাতের সম্ভাবনাকে এখনো পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একটি দেশের কৃষি খাতের উত্পাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানোর জন্য কৃষি যান্ত্রিকায়ন একান্ত প্রয়োজন। কৃষি খাতে যান্ত্রিক পদ্ধতির চাষাবাদ প্রবর্তন করা গেলে তুলনামূলক স্বল্প খরচে অধিক পরিমাণ ফসল উত্পাদন করা সম্ভব। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হলে কৃষকের পরিশ্রমও অনেকটাই কমে যাবে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে সমুদ্র। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকা পাহাড় অধ্যুষিত। দেশের অন্যান্য এলাকা মোটামুটি সমতলভূমি বেষ্টিত। কিন্তু মাটি ও আবহাওয়ার ভিন্নতার কারণে দেশের সব এলাকায় এক রকম ফসল উত্পাদিত হয় না। কোনো এলাকায় হয়তো আলু ভালো উত্পাদিত হয়। আবার কোনো এলাকায় হয়তো লিচুর ফলন বেশি হয়। বাংলাদেশকে প্রশাসনিক কারণে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ফসল উত্পাদনের বিবেচনায় দেশকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করা হয়নি। মাটি ও আবাদযোগ্যতার ভিত্তিতে যদি বিভিন্ন জোনে বিভক্ত করা হতো, তাহলে ফসলের উত্পাদন অনেকটাই বৃদ্ধি পেত। জমির উত্পাদন কার্যক্রমের ওপর বেশি জোর দেওয়া যাবে। বাংলাদেশের কৃষক তাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে জমিতে ফসল উত্পাদন করে থাকে। ভিয়েতনাম তাদের পুরো দেশকে আটটি বা নয়টি ভাগে বিভক্ত করেছে। কোনো ভাগে হয়তো ধান উত্পাদন করা হয়। কোনোটিতে হয়তো আলু উত্পাদন করা হয়। আর কোনো অঞ্চলে হয়তো চিংড়ি মাছ চাষ করা হয়। সব অঞ্চলের মাটি একই গুণাগুণসম্পন্ন নয়।

আমাদের দেশের আবাদি জমিগুলো খবুই ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত। একই ধরনের ফসল উত্পাদনের  উদ্যোগ নেওয়া হলে এসব জমিতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। এতে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে কম খরচে উত্পাদন চালানো সম্ভব হয়। কৃষক লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ হয়। আমাদের দেশে এখনো ক্রপ জোনিং করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমাদের জরুরি ভিত্তিতে ভাবতে হবে। কারণ ভবিষ্যতে আমাদের কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফসল উত্পাদন করা সম্ভব হবে না। কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয়ভাবে কৃষকেরা ক্রপজোনিং করছেন। তবে সেটা পর্যাপ্ত নয়। রাজশাহীর কোনো কোনো অঞ্চলে উচ্চফলনশীল আম উত্পাদন শুরু হয়েছে। তবে সেটা হচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে।

ক্রপজোনিংয়ের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের কৃষকের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ খুবই ছোট ছোট। যারা সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের গড় জমির পরিমাণ আধা একরের মতো। আমাদের দেশের কৃষক মূলত দুটি কারণে কৃষিকাজ করেন। এর একটি হচ্ছে পরিবারের জন্য খাবারের জোগান দেওয়া এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। কৃষক মূলত নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। ফলে তাদের সংগঠিত করা প্রায়শই সম্ভব হয় না। কৃষকদের সংগঠিত করা বেশ কঠিন একটি কাজ। কারণ একেক কৃষক একেক ধরনের ফসল উত্পাদনে আগ্রহী। যারা তৃণমূল পর্যায়ে কৃষিকাজ করেন, তাদের অধিকাংশই বর্গাচাষি। সেখানে জমির মূল মালিকের সম্মতি ছাড়া একই রকম ফসল উত্পাদন করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। আমাদের দেশে কৃষি উত্পাদনের ক্ষেত্রে আরো একটি জটিল সমস্যা হচ্ছে, কৃষক অধিকাংশ সময়ই হুজুগে ফসল উত্পাদন করে থাকেন। যেমন—কোনো এক বছর হয়তো কেউ বেগুন উত্পাদন করে প্রচুর লাভবান হলেন। পরের বছর দেখা গেল, বেশির ভাগ কৃষকই বেগুন চাষে মনোযোগী হলেন। ফলনও ভালো, কিন্তু উত্পাদিত বেগুনের পরিমাণ হয়তো স্থানীয় এলাকার চাহিদার চেয়ে বেশি হলো।  এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

আমি মনে করি, আমাদের দেশে সামাজিক কৃষির ওপর জোর দিতে হবে। সামাজিক কৃষিতে বেশ কিছু সুবিধা পাওয়া সম্ভব। কৃষককে অতি উত্পাদন সমস্যায় ভুগতে হবে না। তারা উত্পাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পাবেন। কোনো কারণে একটি বা দুটি ফসলের সঠিক মূল্য না পেলেও অন্যগুলোর সঠিক মূল্য পাবেন। এতে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। কৃষক সমবায় পদ্ধতিতে কৃষি উত্পাদনের উদ্যোগ নিতে পারেন। বর্তমানে যে সমবায় পদ্ধতি আমাদের দেশে প্রচলিত আছে, তা নানা কারণেই বিভক্ত হয়ে আছে। বিশেষ করে সমবায়ের নেতৃত্ব নিয়ে একধরনের দ্বিধাবিভক্তি আছে। বিশেষ করে দেখা যায়, যার জমি নেই, তিনিও রাজনৈতিক প্রভাবে সমবায়ের নেতৃত্বে চলে আসছেন। এতে সমস্যা সৃষ্টি হয়। নানা প্রতিকূলতার কারণে সমবায় পদ্ধতি তেমন একটা কাজে আসছে না। কিন্তু সামাজিক কৃষিব্যবস্থার নেতৃত্ব উত্পাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের মধ্য থেকেই নির্বাচন করা হবে। যেহেতু সবাই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, তাই তারা অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের ভালো করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

আমাদের দেশের কৃষি উত্পাদনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষিকে যান্ত্রিকায়ন করতেই হবে। কৃষি যান্ত্রিকায়নের উপকারিতা সম্পর্কে কৃষককে বোঝাতে হবে। সরকার নানাভাবে প্রণোদনা দিয়ে কৃষি যান্ত্রিকায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আরো অনেক কিছু করার আছে। সরকার কৃষি যন্ত্রের ওপর নানাভাবে ভর্তুকি প্রদান করছে। কিন্তু সেই ভর্তুকির অর্থ সঠিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি খাতের আধুনিকায়নের জন্য দেশের বাইরে থেকে কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রাসংকটের কারণে কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানি কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি কম্বাউন্ড হারভেস্টার যেখানে আগে ২৮-২৯ লাখ টাকায় বিক্রি করা যেত, এখন তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টাকায়। কৃষকের পক্ষে এত উচ্চমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না।

অনেকে মনে করেন, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সরকার যে ভর্তুকি দিয়ে থাকে, তাতে করে তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক খুব একটা লাভবান হচ্ছেন না। কারণ কৃষক উচ্চমূল্য দিয়ে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে পারেন না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের কৃষকদের নিজস্ব জমির পরিমাণ খুবই কম। তাদের আর্থিক সামর্থ্যও তুলনামূলকভাবে কম। এ ক্ষেত্রে যারা কৃষি উদ্যোক্তা, তারা যন্ত্রপাতি কিনে তা ভাড়ায় ক্ষুদ্র কৃষককে ব্যবহার করতে দিচ্ছেন। এতে সুবিধা হচ্ছে, কৃষি খাতে যান্ত্রিকায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত হচ্ছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত যুবকদের অনেকেই কৃষিযন্ত্র কিনে তাদের নিজের জমিতে ব্যবহার করার পাশাপাশি ভাড়ায় খাটাচ্ছেন। এতে কৃষিতে উচ্চশিক্ষিত লোকের উপস্থিতি বাড়ছে। ভবিষ্যতে কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটা বেশ কাজে দেবে। যারা কৃষিক্ষেত্রে যান্ত্রিক সার্ভিস প্রোভাইড করছেন, তারা যেন সঠিক মূল্যে সার্ভিস দেন তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক:প্রেসিডেন্ট, এসিআই এগ্রিবিজনেস, এসিআই লিমিটেড

অনুলিখন:এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন