একটি দেশের উন্নয়নের জন্য যা অপরিহার্য

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি মৌলিক উপাদান। সরকারকে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বা পরিচালক হিসেবেও অভিহিত করা যায়। এটি একটি সর্বজনীন সংস্থা। সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়। বর্তমান যুগে ‘সরকার’ ধারণাটি আদিম সমাজের বিশৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর শৃঙ্খলাবদ্ধতা এবং যুগে যুগে গবেষণালব্ধ কর্মের অভূতপূর্ব ফলাফল। প্রাচীনকালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত সরকারের কর্মপদ্ধতির ধারণা পরিবর্তিত হচ্ছে।

সরকার একটি রাজনৈতিক সংগঠন। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ নিয়ে সরকার নামক রাষ্ট্র পরিচালনার যন্ত্রটি গঠিত হয়েছে। ‘সরকার’ শব্দটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দুটি অর্থে ব্যবহূত হয়। ব্যাপক অর্থে সরকার বলতে দেশের সব নাগরিককে বোঝায়। সংকীর্ণ অর্থে সরকার বলতে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব কর্মকর্তা, কর্মচারীর সমষ্টিকে বোঝায়।

স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকারের ধারাবাহিকতা একটি রাষ্ট্র বা দেশকে কেমন করে উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এশিয়ার অন্যতম দেশ মালয়েশিয়া। ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে মালয়েশিয়া এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ, যার জনসংখ্যা ৩২.৭ মিলিয়ন এবং মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ১৫০ মার্কিন ডলার!  শিক্ষিতের হার ৯৯ শতাংশ। পুরুষদের গড় আয়ু ৭১ বছর, নারীদের ৭৬ বছর। স্থিতিশীল রাজনীতির সুফল ভোগকারী আরেকটি দেশ হলো সিংগাপুর। এশিয়ার ‘চার বাঘ’খ্যাত ছোট দেশগুলোর একটি সিংগাপুর। বাকি তিনটি দেশ হচ্ছে হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অর্থনীতির র?্যাংকিংয়ে  সিংগাপুর যুক্তরাষ্ট্র ও হংকংকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিজনেস স্কুল আইএমডির  র?্যাংকিং এমনটা জানাচ্ছে। র?্যাংকিংয়ের শীর্ষে সিংগাপুরের উঠে আসার পেছনে দেশটির সরকারের স্থিতিশীলতা, উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা, অনুকূল অভিবাসন আইন এবং নতুন নতুন ব্যবসার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ কাজ করেছে। প্রশ্ন হলো—সিংগাপুরে কাদা, সমুদ্র ও খোলা আকাশ ছাড়া কিছুই ছিল না, সে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এতটা উচ্চতায় উঠে এলো কীভাবে? সিংগাপুরের সবচেয়ে বড় দলটি হলো পিপলস অ্যাকশন পার্টি। দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ সিংগাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি টানা তিন দশক সরকারপ্রধান ছিলেন। দীর্ঘ তিন দশকের শাসনামলে নিজের প্রচেষ্টা ও যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে এক প্রজন্মেই সিংগাপুরকে তৃতীয় বিশ্ব থেকে প্রথম বিশ্বে তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

কম্বোডিয়া ও রুয়ান্ডার কথাও বলা যায়। রুয়ান্ডাকে বর্তমানে বলা হয় সিংগাপুর অব আফ্রিকা। বিগত দুই দশকে রুয়ান্ডার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে, দেশটি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। একসময় রুয়ান্ডার মানুষ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করত। হুতি ও টুসসির আত্মঘাতী সংঘাতের কারণে ভবিষ্যত্ ছিল অন্ধকার, তারা এখন স্বপ্ন দেখছে উন্নত ও আধুনিক জীবনের। রুয়ান্ডার মানুষকে এ স্বপ্ন দেখিয়েছেন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট পল কাগামি, বস্তুত ১৯৯৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এখনো দেশটি শাসন করছেন তিনি। কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ১৯৯৮ সাল থেকে এখনো দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। কম্বোডিয়ার অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেরই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সুষম উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একান্ত জরুরি। তবে শুধু একটি দেশের স্থিতিশীলতা নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও থাকতে হবে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার আমলে যে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে, তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে প্রত্যক্ষভাবে। বিগত প্রায় দেড় দশকের ধারাবাহিক শাসনামলে এ সরকার দেশকে উন্নতির চরম শিখরের দিকে নিয়ে চলেছে। একসময় যা অকল্পনীয় ছিল এ দেশে, তা এখন পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের ঘরের দোরগোড়ায়। স্বাধীনতার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বর্তমান বিভিন্ন ভাতা চালু, তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি—যেমন আশ্রয়ণ প্রকল্প, ঘরে ফেরা, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মতো কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কৃষক ও কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণের ফলে দেশ দ্রুত খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে শেখ হাসিনার সরকার বিএনপি-জামায়াত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে এবং সেই সময়কার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে একটি সুপরিচিত নাম। জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চহার অর্জনের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুহার হ্রাস, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ, শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদেরই শুধু নয়, অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করায় বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালে বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার, ২০২১ সালে তা ২ হাজার ৮১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৫ শতাংশ, বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ শতাংশে এবং অতিদরিদ্রের হার ১০.৫ শতাংশ।

রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, নেতৃত্বের অবদান থাকবে সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে—রাষ্ট্রে, সমাজে, পরিবারে, কলকারখানায়, অফিস-আদালতে, খেলার মাঠে, অর্থাত্ সর্বস্তরে। আমরাও তাই দেখছি, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কারণে বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত, প্রতিবন্ধী ও মুক্তিযোদ্ধাভাতাসহ প্রান্তিক মানুষের জন্য বিভিন্ন ভাতা চালু হয়েছে। সমাজের সব অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ; যেমন—হিজড়া, বেদে, হরিজন, সুইপার, চা-শ্রমিকদের জন্য বাসস্থান, চিকিত্সা, শিক্ষাভাতা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় এখন প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ।

শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানুষের কল্যাণের পক্ষে সোচ্চার দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ বিনির্মাণের যে ভিশন ঘোষণা করেছেন; তাতে শক্তি, সাহস, সক্ষমতা ও প্রেরণা জুগিয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। স্মার্ট বাংলাদেশ কতটা আধুনিক একটি কর্মসূচি, তা এর চার স্তম্ভের লক্ষ্য থেকেই বোঝা যায়। সম্পূর্ণ পরিকল্পনা শর্টটার্ম, মিডটার্ম ও লংটার্ম টাইমফ্রেমে সাজানো হয়েছে—যেমন : স্মার্ট সিটিজেন হবেন বুদ্ধিদীপ্ত, দক্ষ, উদ্ভাবনী, সৃজনশীল, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জাগ্রত দেশপ্রেমিক এবং সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবনী মানসিকতাসম্পন্ন নাগরিক। প্রত্যেক নাগরিকের প্রযুক্তিতে অভিযোজন ও অভিগম্যতা নিশ্চিত করা হবে। স্মার্ট ইকোনমিতে গড়ে উঠবে ক্যাশলেস, সার্কুলার (বৃত্তাকার), উদ্যোক্তামুখী, গবেষণা ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি। আর্থিক লেনদেন হবে নগদবিহীন। পণ্যের পুনঃব্যবহার করে বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই), রোবটিক্স, ব্লকচেইন, ড্রোনসহ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অগ্রসর প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা ও উদ্ভাবনী সমাধান হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য প্রধান চালিকাশক্তি।

যোগাযোগে কাগজের ব্যবহার হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে। অগ্রসর প্রযুক্তির ব্যবহার করে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, জ্বালানি, বিদ্যুত্, বিচারব্যবস্থার মতো জরুরি খাতগুলো পরিচালিত হবে অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এ দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা আত্মসম্মানবোধ ও আত্মপ্রত্যয়ী এক জাতি হিসেবে। বঙ্গবন্ধু তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার অনলস প্রয়াস, দেশপ্রেম ও অপ্রমেয় দূরদৃষ্টি এক্ষেত্রে কাজ করেছে। তাই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে কেউই আর তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করতে সাহস পায় না। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক আদর্শ হিসেবে পরিগণিত। উন্নয়নের পথে এই অগ্রযাত্রা সাধিত হতে পেরেছে বহু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকার একাদিক্রমে তৃতীয় মেয়াদে দেশের শাসনযন্ত্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে পেরেছে বলেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরপর প্রতিবিপ্লবী শক্তি ও প্রতিক্রিয়াশীলরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। যার ফলে বাংলাদেশ কয়েক দশক পিছিয়ে গেছে, আর চলেছে ইতিহাস বিকৃতি চর্চার এক কালো অধ্যায়। এই প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা একা নিজে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী, নারী, বিশেষত তরুণ সমাজ ও দেশের আপামর সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে সংগ্রাম করেছে।

শেখ হাসিনা তার বিগত চার দশকের রাজনীতির মাধ্যমে, তিনি নিজে, আওয়ামী লীগ,  স্বাধীনতার পক্ষ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন-আদর্শ ও বাংলাদেশের অস্তিত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একাকার হয়ে গেছেন। শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য নিজেদের ঘরের মেয়ে বলে হয়তো আমরা কাছ থেকে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখতে পাই না এবং অবদান সবটুকু উপলব্ধি করি না, তাই নিরপেক্ষতার আতশিকাচের নিচে ফেলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায়কে ইতিহাসের পরম্পরায় বিচার করার সময় আজ উপস্থিত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনা না থাকলে মুখ থুবড়ে পড়বে চলমান সব উন্নয়ন প্রকল্প। ডিজিটাল বাংলাদেশের সফল রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রেসিডিয়াম সদস্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ

ইত্তেফাক/এমএএম