রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কমিউনিটি পুলিশিং জনগণের পুলিশ

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:৩০

কোনো ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে সাধারণ অর্থে ‘কমিউনিটি’ বলে। বৃহত্ অর্থে কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানও কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত। ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ অর্থ কমিউনিটি কর্তৃক পরিচালিত পুলিশি ব্যবস্থা (community driven policing system)। অন্য ভাষায় বলা যায়, কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় অপরাধ দমন ও উদ্ঘাটন, অপরাধীদের গ্রেফতার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পুলিশ এবং ঐ এলাকার জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমস্যা ও সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাধানের উপায় উদ্ঘাটন ও বাস্তবায়নের পদ্ধতিই ‘কমিউনিটি পুলিশিং’। কমিউনিটি পুলিশিং একটি গণমুখী (community oriented), প্রতিরোধমূলক (proactive) এবং সমস্যার সমাধানকল্পে (solution based) পুলিশি ব্যবস্থা ও দর্শন, যা জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা ও  মতামতের  ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এর মূল কথা হলো, ‘পুলিশই জনতা এবং জনতাই পুলিশ’ (The police are public and the public are police)।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মূলত অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সমাজের বহুবিধ সমস্যা সমাধানে পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি কার্যকর ও টেকসই গণমুখী পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে সমস্যা ও সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানের পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া। অপরাধ দমন ও সামাজিক সমস্যা সমাধানে জনগণকে ক্ষমতায়ন করা এবং জনকল্যাণে কমিউনিটি সম্পদের (community resource) সদ্ব্যবহার ও জনগণের মেধাকে কাজে লাগানো। সর্বোপরি পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ‘জনতাই পুলিশ এবং পুলিশই জনতা’ (The police are public and the public are police) নীতি সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।

উল্লেখ্য, কমিউনিটি পুলিশিং হলো পুলিশকে সহায়তা করার জন্য জনগণের একটি সংগঠিত শক্তি। কাজেই প্রচলিত আইনে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সমর্থন আছে। আমাদের দেশের পঞ্চায়েতব্যবস্থা এবং গ্রামের গণ্যমান্য ও মাতব্বর কর্তৃক শালিশির মাধ্যমে বিরোধের মীমাংসা প্রকারান্তরে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থারই জনস্বীকৃত নিদর্শন।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো এ সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ ধারণার অভাব। তাছাড়া কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সম্পদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতে সরকারি অর্থের বরাদ্দ নেই এবং জনগণের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান সংগ্রহ করা একটি কঠিন ব্যাপার। এমতাবস্থায় সব শ্রেণি ও পেশার লোকদের কমিউনিটি পুলিশিং কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে জনগণের মধ্যে সাড়া জাগাতে হবে। ভৌগোলিক অবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ ও জনগণের চাহিদার আলোকে কর্মকৌশল অবলম্বন করে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে।

পুলিশ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হলেও স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশের কাজ সেবামুখী (service oriented) হওয়াই বাঞ্ছনীয়; যা পুলিশ ও জনতা উভয়েরই প্রত্যাশা। জনগণ পুলিশের সেবার সেবাভোগী গোষ্ঠী (target group)। পুলিশের সেবা জনগণ কীভাবে নিচ্ছে এবং জনগণের চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী পুলিশ সেবা দিতে পারছে কি না, তা জানার জন্য পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন ও সম্প্রীতি স্থাপন অপরিহার্য। সমাজে অপরাধের ধরন, কৌশল ও মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনে দিনে নতুন নতুন সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের কাজ এবং পুলিশের ওপর জনগণের প্রত্যাশাও দিনে দিনে বাড়ছে। পুলিশের আছে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা। লোকবলের স্বল্পতার প্রকট। প্রতি ৮৫০ জনের জন্য ১ জন পুলিশ। দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট, পরিবহন, সাজ-সরঞ্জাম, কাজের পরিবেশ, বাসস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। পুলিশের মধ্যেও রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের মনমানসকিতা; আছে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানুষকে হয়রানি, অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ।

পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সমঝোতা ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি করতে হলে পুলিশের মনমানসিকতা, আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডে গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন আনতে হবে এবং জনগণকে পুলিশের কাজে সম্পৃক্ত করে জনগণের প্রত্যাশা, মতামত ও চাহিদার ভিত্তিতে জনগণেরই সহায়তায় পুলিশি কার্যক্রম চালাতে হবে। আর এই ব্যবস্থাই হবে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা। পুলিশের কাজের সফলতা এবং জনগণের কাছে পুলিশের কাজের সমর্থন পেতে হলে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের বিকল্প  নেই। পুলিশকে হতে হবে গণমুখী, সেবাধর্মী ও পেশাদার এবং একই সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সহযোগিতার সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে, যার সুফল জনগণ ও পুলিশ উভয়েই পাবে। একটি স্বাধীন দেশে ও গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণ পুলিশের কাছে এটাই প্রত্যাশা করে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পুলিশ সপ্তাহে ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে বঙ্গবন্ধু পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। ঐ ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘একটা কথা আপনাদের ভুললে চলবে না। আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। আপনারা বিদেশি শোষকদের পুলিশ নন, জনগণের পুলিশ। আপনাদের কর্তব্য জনগণের সেবা করা, জনগণকে ভালোবাসা, দুর্দিনে জনগণকে সাহায্য করা। আপনাদের বাহিনী এমন যে, এর লোক বাংলাদেশের গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে। আপনাদের কাছে বাংলাদেশের মানুষ এখন একটি জিনিস চায়। তারা যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারে। তারা আশা করে, চোর, বদমাশ, গুন্ডা, দুর্নীতিবাজ যেন তাদের ওপর অত্যাচার করতে না পারে। আপনাদের কর্তব্য অনেক।’

লেখক:পুলিশ সুপার, নৌ-পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন