‘কনফারেন্স অব পার্টিজ’-এর গুরুদায়িত্ব

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৩০

পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করিবার বিষয়টিকে এই ধরিত্রীর বুকে মানুষের বাঁচা-মরার সহিত তুলনা করা হইয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা একটি ব্যাপারে একমত যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাস করিতেই হইবে। যদিও সৃষ্টির শুরু হইতে এখন অবধি পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটিয়াছে শতসহস্র বার। ইহা প্রকৃতির একটি নিরন্তর খেলা। বিজ্ঞানীরা ধারণা করিয়া থাকেন, এখন অবধি পাঁচ বার পৃথিবীতে প্রাণের মহাবিলুপ্তি ঘটিয়াছে। আমরা নুহ নবির (আ.) নৌকার কথা জানি, যখন পৃথিবীতে মহাপ্লাবন হইয়াছিল। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, পৃথিবীতে জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্যই একেক সময় প্রাণের মহাবিলুপ্তি ও মহাপ্লাবনের মতো ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়াছিল; কিন্তু প্রায় ৩০০ বত্সর পূর্বে শুরু হওয়া শিল্পায়নের পর হইতে এখন অবধি পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়াছে।

এই ধরিত্রীকে রক্ষা করিতে প্রথম জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল জার্মানির বার্লিনে, ১৯৯৫ সালে। এইবার মরুশহর দুবাইতে অনুষ্ঠিত হইয়াছে ২৮তম জলবায়ু সম্মেলন, যাহার আনুষ্ঠানিক নাম কনফারেন্স অব পার্টিজ-২৮ বা কপ-২৮। যদিও বহু পরিবেশবাদী সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞ সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হওয়া জলবায়ু সম্মেলন বা কপ ২৮-এ আলোচনার ফলাফল লইয়া উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছিলেন। কারণ, আরব আমিরাত নিজেই অন্যতম একটি জীবাশ্ম জ্বালানি উত্পাদনকারী দেশ। তবে আয়োজক যাহারাই হউক না কেন, কপ সম্মেলনের সাফল্যের বিষয়টি ধারাবাহিক ও দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ। ইতিমধ্যে ২৮টি বত্সর হইয়া গিয়াছে এই ধরনের সম্মেলনের। প্রতি বত্সরই অল্পবিস্তর অগ্রগতি থাকে, অন্তত ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার অগ্রগতি তো থাকেই। এই বত্সর কপ-২৮-এর শীর্ষ সম্মেলনে মূলত চারটি ‘বিশেষ পরিবর্তন’-এর উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হইয়াছে। উহা হইল—জীবাশ্ম জ্বালানি হইতে ক্রমশ বাহির হইয়া আসিবার কার্যক্রম আরো ত্বরান্বিত করা; জলবায়ু অর্থ ব্যবস্থার রূপান্তর; জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জনগণ এবং প্রকৃতির ভূমিকা এবং নারী, আদিবাসী, স্থানীয় সম্প্রদায়, তরুণদের শীর্ষ সম্মেলনে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।

বিশ্বের যেই সকল দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে সবচাইতে অধিক ঝুঁকিতে রহিয়াছে, বাংলাদেশ তাহাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে এখন দুর্যোগ অধিক হইতেছে, নদীভাঙন বাড়িতেছে, বেশি বেশি ঝড়, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হইতেছে। ইহার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে তৈরি হইতেছে মরু শুষ্কতা এবং দক্ষিণবঙ্গে বাড়িতেছে লবণাক্ততা। এই সকল কিছুই হইতেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে; কিন্তু এই জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য যত কার্বন নিঃসারণ হয়, সেইখানে বাংলাদেশের মতো দেশগুলির দায় খুবই সামান্যই; কিন্তু ভোগান্তি অনেক বেশি। এই কারণেই সংকট মোকাবিলায় তহবিল বরাদ্দ ও তাহার ব্যয়ের উপর জোর দিতেছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহ। দুবাইয়ে কপ-২৮ সম্মেলন শুরু হয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি তহবিল ঘোষণার মাধ্যমে। সম্মেলনের প্রথম দিনেই তহবিলের ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি আসে ৪২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যাহা নবম দিনে আসিয়া ঠেকিয়াছিল ৭২ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। যদিও কার্বন নিঃসারণ কমাইবার যেই শর্ত—তাহা বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন।

অনেক বিজ্ঞানী বলিয়া থাকেন, প্রাক-শিল্পায়নের যুগ হইতে এখন অবধি প্রায় ৩০০ বত্সরের হিসাব দিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট সমীকরণ টানিবার সুযোগ নাই। কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। অন্যদিকে কার্বন নিঃসারণ কমাইবার শর্তের মধ্যে বৈষম্যও দেখিতে পাইতেছে উঠতি শিল্পোদ্যোগী দেশসমূহ। কারণ, যাহারা ইতিপূর্বে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হইয়াছে, তাহারা এতকাল নির্বিচারে কার্বন নিঃসারণ করিয়াছে; কিন্তু যাহারা এখন শিল্প-কলকারখানার মাধ্যমে তাহাদের অর্থনীতিকে উন্নতির কাতারে লইয়া যাইতে শুরু করিয়াছে, তাহারা কেন এখন এত রকম শক্ত শক্ত শর্ত মানিবে? মনে রাখিতে হইবে, আমাদের একটাই প্লানেট। সুতরাং প্রতি বত্সর ‘কনফারেন্স অব পার্টিজ’-এর কাঁধেই বর্তায় পৃথিবীকে রক্ষারও মহাদায়িত্ব।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন