আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হইলে বুদ্ধিজীবীরা জাতির মস্তিষ্ক। তাহাদের মেধা ও শ্রম জাতি গঠনে সহায়তা করে, জাতিকে আলোর পথ দেখায়। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশ ও স্বাধীনতাপ্রাপ্তির মূলে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অসামান্য অবদান রহিয়াছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভ হইতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞের সূচনা করিয়াছিল, শেষদিকে আসিয়া তাহা রূপ নেয় বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে। পরাজয় নিশ্চিত জানিয়া পাকিস্তানিরা তাহাদের দোসরদের সহযোগিতায় বাছিয়া বাছিয়া হত্যা করিয়াছিল জাতির অগ্রণী শিক্ষক, শিল্পী, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের। এই সকল হত্যার কারণ ছিল স্পষ্ট। পরাজয়ের পূর্বমুহূর্তে তাহারা চাহিয়াছিল স্বাধীনতার পথে আগাইয়া যাওয়া দেশটিকে মেধাশূন্য করিতে।

একটা জাতিকে পরাস্ত করিতে হইলে কীভাবে মাথায় আঘাত করিতে হয় তাহা পাকিস্তানি হানাদাররা ইতিহাসের পাতা হইতে বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করিয়াছিল। হালাকু খানের নেতৃত্বে মোঙ্গলরা যখন বাগদাদ অবরোধ করিয়া নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তখন তাহারা প্রথম বাগদাদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র বাইতুল হিকমাহ লাইব্রেরি ধূলিসাত্ করিয়া দেয়। কথিত রহিয়াছে, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলা আক্রমণ করিবার সময় এই অঞ্চলে বৌদ্ধদের দ্বারা নির্মিত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করিয়া তাহাদের জ্ঞানচর্চা রুখিয়া দেওয়ার প্রচেষ্টা করিয়াছিলেন। প্রতিপক্ষকে দমন করিতে মস্তিষ্কে আঘাত হানিয়া বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ রোধ করিবার এমন দৃষ্টান্ত পূর্বে বহুবার ঘটিয়াছে; কিন্তু ঠান্ডা মাথায় বুদ্ধিজীবীদের হাত-পা, চোখ বাঁধিয়া ঘর হইতে তুলিয়া লইয়া নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করিবার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। ন্যক্কারজনক ঐ পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কোনো সভ্যসমাজ বা রাষ্ট্রে কল্পনা করা যায় না।

মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা যেমন হারাইয়াছি অসংখ্য বীর যোদ্ধাকে, তেমনি হারাইয়াছি শত শত দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীকে—যাহারা নিজ নিজ পেশায় ছিলেন আলোকবর্তিকা। স্বাধীন বাংলাদেশকে আলোর পথ দেখানোর পূর্বেই পাকিস্তানি হানাদারদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছিলেন অধ্যাপক জি সি দেব, মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশেদুল হাসান, ড. আনোয়ার পাশা, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, নিজামউদ্দীন আহমেদ, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, সাহিত্যিক সেলিনা পারভীনসহ আরো অনেকে। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশ গড়ায় তাহারা সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখিতে পারিতেন। দেশ গঠনে তরুণ-যুবকদের মনে নতুন উদ্যম সঞ্চার করিতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারিতেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা এবং তাহাদের অভাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মনে কতটা ক্ষত তৈরি করিয়াছিল তাহা অনুমান করা যায় বঙ্গবন্ধুর আবেগঘন বক্তৃতার মাধ্যমে। ১৯৭২ সালের গণবাহিনীর উদ্দেশে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বর্বর হানাদার শত্রুরা আমাদের সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করিবার জঘন্য প্রচেষ্টায় মাতিয়াছিল। যেই সকল মনীষী আমাদের সমাজের উন্নতির পথ প্রদর্শন করিতে পারিতেন, সেই সকল বুদ্ধিজীবী ও দক্ষ জনশক্তিকে তাহারা নির্মমভাবে হত্যা করিয়াছে। আমরা বহু অমূল্য প্রাণ হারাইয়াছি। এই বিরাট ক্ষতি পূরণ করিবার লক্ষ্যে আমাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে নয়া দক্ষ জনশক্তি গড়িয়া তুলিতে হইবে।’

বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা মৃত্যুর পূর্বে তাহাদের কর্মে ও লেখনীতে সংগ্রাম কিংবা বিদ্রোহের যেই সবক দিয়াছিলেন, যেইভাবে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করিয়াছিলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে যেইভাবে অগ্রসরমাণ হইয়াছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াছিলেন, দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে যেইভাবে অনাচার-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইবার সাহস ও শক্তির জোগান দিয়াছিলেন, তাহা ধারণ করিয়া আমাদেরকে আগাইয়া যাইতে হইবে। ১৪ই ডিসেম্বর আমাদের জন্য শুধু শোকের দিবস নহে, এই দিনটি হউক বাংলার সকল প্রজন্মকে সঙ্গে লইয়া সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়িবার শপথ গ্রহণের দিবস।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন