বিজয় দিবসের প্রত্যাশা ও অঙ্গীকার

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:৫৯

আজ ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের মহান বিজয় দিবস। ৫২ বত্সর পূর্বে একসাগর রক্তের বিনিময়ে এই দিন বিশ্বমানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের। ইহাতে আমরা পাই আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িবার আহ্বান জানাইয়াছিলেন, ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সেই উদ্যানেই আজিকার দিনে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। তাই ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির হাজার বত্সরের ইতিহাসে সবচাইতে গৌরবময় ও অহংকারের দিন।

পৃথিবীর প্রায় সকল স্বাধীন দেশেরই রহিয়াছে স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু অনেক দেশেরই নাই বিজয় দিবস। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সম্মুখে রাখিয়া স্বাধীনতা ঘোষণার পর সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়া বিজয় অর্জন বাঙালি জাতিকে করিয়াছে অনন্য ও গৌরবান্বিত। অঞ্চলভিত্তিক খণ্ডযুদ্ধ জয়ের দুই-একটি দৃষ্টান্ত অতীতে থাকিলেও ভাষাভিত্তিক বাঙালিত্বের পরিচয়ে এবং বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে এমন শৌর্য-বীর্যময় বিজয় লাভ বাঙালির জাতীয় জীবনে পূর্বে আর কখনোই ঘটে নাই। তাই মহার্ঘ্য এই অর্জন লইয়া আমাদের আনন্দ ও শ্লাঘার শেষ নাই।

আজি হইতে অর্ধশত বত্সরেরও পূর্বে আমরা এই দিনে লাভ করি একটি স্বাধীন দেশ, তাহার মানচিত্র ও পতাকা। কিন্তু স্বাধীনতা লাভ মানেই সার্বিক মুক্তি নহে। আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের চাওয়া-পাওয়া ছিল ব্যাপক। আমাদের স্বপ্ন ছিল স্বাধীন দেশে কোনো বৈষম্য থাকিবে না, দারিদ্র্য থাকিবে না। মানুষ শান্তিতে ঘুমাইতে পারিবে, অবাধে চলাফেরা করিতে পারিবে। মানবাধিকারসহ নাগরিকদের বিভিন্ন অধিকার সুরক্ষিত থাকিবে। একটা সময় পর এই সকল চাওয়া-পাওয়াও হয়তো আমাদের পূর্ণ হইবে। তবে এই জন্য সিস্টেম বা পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করিতে হইবে। বিভিন্ন জাতীয় ইনস্টিটিউশন বা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার পাশাপাশি ইহাকে অধিকতর বিকশিত ও শক্তিশালী করিতে হইবে। গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির সক্ষমতা বাড়াইতে হইবে। বিশেষ করিয়া রাজনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে পিসফুল ট্রান্সফার অব পাওয়ার তথা ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর নিশ্চিত করিতে হইবে।

হাঁটি হাঁটি পা পা করিয়া আজ বাংলাদেশ বিজয়ের ৫৩তম বর্ষে পদার্পণ করিল। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া আমরা কী চাহিয়াছিলাম আর কী পাইলাম, তাহার চুলচেরা আত্মবিশ্লেষণ দরকার, যাহাতে আমাদের আগামীর পথচলা আরো সুপ্রসন্ন ও কণ্টকমুক্ত হয়। কোনো সন্দেহ নাই যে, দেশ স্বাধীন না হইলে বাঙালি আজ বিশ্বে যেইভাবে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহা কখনোই সম্ভব হইত না। তবে স্বাধীনতা লাভ করিয়া আমরা প্রত্যাশা অনুযায়ী কতটা কী করিতে পারিলাম, তাহা লইয়া আমাদের মধ্যে এখনো বিভেদ বা মতপার্থক্য রহিয়াছে। সেই জন্যই এত মারামারি ও পিটাপিটি বলিয়া আমরা মনে করি। তবে এই সকল দ্বন্দ্ব ও মতপার্থক্যও যতটা সম্ভব দূর করিয়া আমাদের জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করিতে হইবে। স্বাধীনতাসংগ্রাম ও অর্জনকে কেন্দ্র করিয়া বিদ্যমান বিতর্কের অবসান না হইলে জাতি হিসাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইব। ইহাতে আমাদের উন্নতি ও সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হইবে।

আমাদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত যতই পার্থক্য থাকুক, বিজয় দিবস এলেই চেতন-অবচেতন মনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম অবশ্যই আসিবে। কেননা জাতির স্বাধিকার ও স্বাধীনতাসংগ্রামে তাহার নেতৃত্বের অবদান কখনো বিস্মৃত হইবার নহে। সেই সঙ্গে এই কথাও স্বীকার করিতে হইবে যে, বাংলাদেশ ক্রমেই উন্নতির শিখরে অগ্রসর হইতেছে। বিশেষত গত দেড় দশকে এই দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগিয়াছে, তাহা যে কোনো বিবেকবান ব্যক্তিই স্বীকার না করিয়া পারিবেন না। এই সকল উন্নয়ন ও অগ্রগতি এই দেশের প্রতি বিদেশিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছে। কিন্তু জাতিকে আরো টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি উপহার দিতে হইলে জাতিগত কনফ্লিক্ট রিজলভের ক্ষেত্রে আমাদের দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হইবে। একজন সফল রাষ্ট্রনায়কই পারেন সেই সকল ত্রুটিবিচ্যুতি চিহ্নিত করিয়া জাতির নতুন পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে। এই জন্য দেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও  সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করিবার কোনো বিকল্প নাই। এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সকলকে অঙ্গীকারবদ্ধ হইতে হইবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি