লাখো প্রাণে জড়ানো ১৬ই ডিসেম্বর

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৩০

‘শোষণ-পীড়ন জেল-জুলুমে/ শৃঙ্খলিত বন্দী থেকে, রঙে রঙে তোমার ছবি/ মানসপটে নিপুণ এঁকে, হই গরিলা অস্ত্র ধরি/ মাতৃভূমি স্বাধীন করি।’ ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি জাতির প্রতিক্ষিত আনন্দময়ী এক অধ্যায়। ১৯৪৮ সাল থেকে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, ’৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১-এর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহিদ, দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগ এবং হাজারো বুদ্ধিজীবীর প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

বিজয়ের ৫২ বছর পূর্তির দিন আজ। ১৬ই ডিসেম্বর দিনটি আমাদের গোটা বাঙালি জাতির জন্য গৌরবের দিন। এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শোষণের হাত থেকে বিজয় নিশ্চিত করে নবাংলার সূর্যসন্তানেরা। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস হিসেবে উদ্যাপন করা হয় এবং সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯১ হাজার ৬৩৪ জন সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে  বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। এর ফলে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিজয় দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চলচ্চিত্র, কবিতা, প্রবন্ধ, গণমাধ্যম ইত্যাদিতে বিভিন্নভাবে বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়। এই দিন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের আয়োজন করে থাকে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুচকাওয়াজ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। এছাড়া দেশের প্রতিটি উপজেলায় বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ, বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান, মতবিনিময় সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। দেশের প্রধান সড়কগুলো জাতীয় পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এই দিনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর উপস্থিতিতে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে রাজনীতিবিদসহ সাধারণ মানুষ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সবাই সমস্বরে গাইতে থাকেন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত—‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

বাঙালির সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক জীবনের ক্রমবিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বাঙালির শৌর্য-বীর্য যেন আর এক বার ধপ করে জ্বলে ওঠে এই দিনে। বাঙালির বুকের ভেতরে জ্বলে ওঠে জালাময়ী আগুন, যে আগুনের উষ্ণতায় শহিদেরা ছিনিয়ে এনেছেন সোনার বাংলা। ১৬ই ডিসেম্বরকে নতুন মাত্রায় রূপ দিতে বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ২০১৩ সালে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭ হাজার ১১৭ জন স্বেচ্ছাসেবী বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার লাল ও সবুজ ব্লক নিয়ে একত্রে জড়ো হয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মানব পতাকার নতুন বিশ্ব রেকর্ড করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বর্ষ জুড়ে চলা কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি হয় ১৬ই ডিসেম্বর ২০২১ সালে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মাধ্যমে। প্রতি বছর কোনো না কোনোভাবে বাঙালির অহংকার এই দিনকে বাংলার মানুষ স্মরণীয় করে রাখে। স্মৃতিময় এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সোনার সন্তানদের দেশের জন্য ত্যাগ, লাখো মা-বোনের হারানো সম্মান, দেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া হাজারো মেধাবী তরুণ, দেশের সোনার রত্ন বুদ্ধিজীবী, চিকিত্সক ও আইনজীবী। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। ৯ মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে এসেছে নতুন প্রভাত।

লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি আনন্দমোহন কলেজ

ইত্তেফাক/এএইচপি