এখন প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:০০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের যাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালে। আর আমি এই বিভাগে যুক্ত হই ২০০৪ সালে। বিশ্বব্যাপী জেন্ডার-বৈষম্য একটি জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জেন্ডার-বৈষম্য শুধু মানুষের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে তা নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে। জেন্ডার-বৈষম্যেও নেতিবাচক প্রভাব সমাজের সর্বস্তরেই পড়ে।

আমাদের দেশের নারী, ট্রান্সজেন্ডার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে। সমাজিক দৃষ্টিতেও এরা অবহেলিত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান থেকে নারীরা আগের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু এখনো এ ক্ষেত্রে আরো অনেক কিছু করার আছে। কারণ উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কর্মক্ষেত্রে আমাদের নারীরা সংখ্যা এবং গুণগত দিক থেকে পিছিয়ে আছে। একই গুণসম্পন্ন একজন পুরুষ যেভাবে সমাজে তার অবস্থান তৈরি করে নিতে পারছে, নারীর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নের দিকে না যাই, তাহলে কোনো একটি পরিবার, সমাজ ও দেশ স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে না। আপনি যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জ্ঞানভিত্তিক  সমাজ গড়ে তুলতে না পারেন, তাহলে আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা টেকসই হবে না। জ্ঞান হচ্ছে একজন মানুষের বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপকরণ। আমরা ছাত্রছাত্রীদের আগামী দিনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছি। এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে নারী-পুরুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নারী ও পুরুষের প্রতি একই রকম হবে। আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে নারী-পুরুষের জন্য একটি অভিন্ন পৃথিবী গড়ে তোলা। আমরা সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছি।

বাংলাদেশের সামজব্যবস্থাকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ বলে আখ্যায়িত করা যায়। এর একটি অংশ হচ্ছে শ্রমবিভাজন। পুরুষেরা সাধারণত ঘরের কাজ করেন না। তারা বাইরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। আর নারীরা ঘরের কাজ করে থাকেন। এমনকি নারীরা যদি বাইরে চাকরি বা অন্য কোনো পেশায় নিয়োজিত থাকেন, তাহলেও তাকেই ঘরের কাজ সামাল দিতে হয়। এটা একধরনের অপরিবর্তনীয় রীতিতে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষেরাও নারীদের ঘরের কাজে সহায়তা করে থাকেন। তবে সেটা খুবই বিরল। আমাদের সমাজে যে কাজের মাধ্যমে নগদ অর্থ উপার্জিত হয়, সেই কাজকেই আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু নারীরা গৃহের অভ্যন্তরে যে কাজ করে থাকেন, তার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না। যেমন—একজন নারী যদি তার সন্তানকে লালন-পালন করেন, সেটাকে অর্থনৈতিক কর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। অথচ এই একই কাজ যদি কোনো চাইল্ড হোমের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়, তাহলে সেখানে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এভাবেই বহু বছর ধরে চলে আসছে। ইদানীং এ ব্যাপারে কিছুটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তা যথেষ্ট নয়। জিডিপিতেও নারীদের কাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। সেখানে আর্থিক সম্পৃক্ত কাজগুলোকেই যুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু নারী যে ঘরের কাজে সহায়তা করছে, তার সেই কাজের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। সবাই শুধু তাত্ক্ষণিক অর্থপ্রাপ্তি ঘটে সেই কাজকেই কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। নারীর কাজকে কোনো কাজ হিসেবেই মনে করা হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত নয় এমন কোনো নারীকে যদি প্রশ্ন করা হয় আপনি কী করেন, তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবেই উত্তর দেবেন, আমি কিছু করি না। আমার স্বামী চাকরি করেন।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয়েছে, নারীরা পারিশ্রমিকবিহীন যে কাজ করেন, তার আর্থিক মূল্য জিডিপির ৮৯ শতাংশের মতো। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক কার্যক্রম জিডিপির বাইরে থেকে যাচ্ছে। নারীর গৃহকর্ম ও পারিশ্রমিকবিহীন কর্মকে যদি জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতো, তাহলে আমাদের জিডিপির আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেত। সরকার নারীদের পারিশ্রমিকবিহীন কাজকে জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন বলে শোনা যায়। এটা করা হলে দেশের অর্থনীতির সঠিক চিত্র আমরা দেখতে পাব। আবার বিশ্রামের ক্ষেত্রে পুরুষেরা নারীদের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি সময় পায়। নারী-পুরুষ বৈষম্যের নানা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর প্রতি বিরূপ আচরণ রোধে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নারী যে গৃহকোণে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, তা নিরসনে তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গৃহ অভ্যন্তরে নারীরা যে কাজ করেন, তার মূল্যায়ন না করে বাইরের কাজে নারীদের মূল্যায়ন করা হলে সেটা তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। অন্যথায় নারীর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। নতুন শিক্ষা কার্যক্রমে স্কুলে রান্না শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে দেশে হইচই শুরু হয়েছে। আসলে আমরা সনাতনকে বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকতে চাই। ব্রিটিশ শাসনের একটি কুফল হচ্ছে, আমরা পুরোনো ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে কোনোভাবে টিকে থাকতে চাই। জীবনের জন্য যা প্রয়োজন, জীবনকে সুন্দর করার জন্য যা দরকার, তা পরিবার থেকে শেখানো হোক আর না হোক, স্কুল থেকে শেখাতে হবে। যা কিছু সুন্দর, আমাদের তা-ই শিখতে হবে। কোথা থেকে শিখলাম, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। পরিবার হচ্ছে সরকারের আওতাবহির্ভূত একটি স্বতন্ত্র সত্তা। সরকারের অধীনে থাকে স্কুল-কলেজ। কাজেই সরকার যদি ইউনিফর্ম ওয়েতে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তাতে ক্ষতি কী? প্রত্যেক কাজেই প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন আর উন্নয়ন এক বিষয় নয়। নারী কাজের মাধ্যমে অর্থ আয় করলে সেটা হবে উন্নয়নের পথে ধাবিত হওয়া। আর সেই উপার্জিত অর্থ কীভাবে এবং কোথায় ব্যবহূত হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার হচ্ছে নারীর ক্ষমাতায়নের অংশ। নারীর জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব সিদ্ধান্ত যদি নারী গ্রহণ করতে পারে, তাহলেই সেটাকে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন বলা যেতে পারে। আমরা এই অবস্থা থেকে এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছি। তবে সরকার এক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এগোচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন আইনকানুন তৈরি করা হচ্ছে। নারীর জন্য নানা কাজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নারীরা উপার্জনের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে না। তবে এখনো আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে। এবং তা করতে হবে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। গত দুটি দশককে যদি আগের যে কোনো সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে বোঝা যাবে আমরা কতটা এগিয়েছি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তাই তাদের পেছনে ফেলে রেখে এগিয়ে যাওয়া, প্রকৃত উন্নয়ন অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত এসডিজির একটি অন্যতম শর্ত হচ্ছে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। সবাইকে সম্পৃক্ত করেই টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সনাতন মানসিকতার কারণে নারীর উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার নারীর উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমাদের এসব সুযোগ গ্রহণ করতে হবে। কিছু মানুষ আছেন, যারা নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেই তার বিরোধিতা করেন। জিডিটাল প্ল্যাটফরমের কারণে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। পাশাপাশি কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। তার পরও এটা স্বীকার করতেই হবে যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এখন গ্রাম আর শহরের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে।  গ্রামের মানুষও এখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে। গ্রামের সাধারণ একটি মেয়েও আমার চেয়ে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে সদস্য হিসেবে যুক্ত আছি। এখানে ১২টি থিমেটিক কমিটি আছে। একেকটি ইস্যুভিত্তিক এক জন করে ইনচার্জ আছেন। আমি নারী ও শিশু সহিংসতার বিষয়টি দেখি। কীভাবে নারীর প্রতি বৈষম্য কমিয়ে এনে তাদের উন্নয়নে কাজ করা যায়, আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। আমরা নানাবিধ কাজে হাত দিচ্ছি। নারীদের ওপর যৌন হয়রানি রোধে নীতিমালা তৈরি এবং সংশোধন করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ভায়োলেন্সের ব্যাপারেও বিদ্যমান আইন সংশোধন করা হচ্ছে। আমরা এমন একটি আইন তৈরি করতে চাই, যেখানে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং ভবিষ্যতে নারীদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দেওয়া সম্ভব হয়।

লেখক: উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

অনুলিখন: এম এ খালেক

ইত্তেফাক/এএইচপি