আইএমএফের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থছাড়

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৩০

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির নির্বাহী পর্ষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন হয়েছে। বাংলাদেশ এ দফায় ২০২২ সালের জুলাইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণ চায়। ছয় মাস পর সংস্থাটি গত ৩০ জানুয়ারি ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

বলা হয়, ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে মোট সাত কিস্তিতে পাওয়া যাবে এ অর্থ। আইএমএফ পর্ষদ ঋণপ্রস্তাব অনুমোদন করার দুদিন পর গত ২ ফেব্রুয়ারি ঋণের প্রথম কিস্তির অর্থ ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার  পায় বাংলাদেশ। গত ৩০ জানুয়ারি অনুমোদন হওয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দ্বিতীয় কিস্তিসহ ছয়টি কিস্তি সমান হারে দেবে আইএমএফ। ঋণের গড় সুদের হার ২.২ শতাংশ। ৪৭০ কোটি ডলারের মধ্যে দুই ধরনের ঋণ রয়েছে। বর্ধিত ঋণ সহায়তা ও বর্ধিত তহবিল (ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফ) থেকে পাওয়া যাবে ৩৩০ কোটি ডলার। রেজিলিয়্যান্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির আওতায় পাওয়া যাবে ১৪০ কোটি ডলার। ঋণ অনুমোদনের সময় আইএমএফ জানিয়েছে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক ব্যয়ে সক্ষমতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা, নীতিকাঠামো আধুনিক করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কাজে এই ঋণ সাহায্য করবে। ঋণকর্মসূচির আওতায় দেওয়া শর্ত অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রাজস্ব আয় অর্জন সম্ভব হয়নি। তবে অন্যান্য শর্তে কিছু অগ্রগতি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার-কার্যক্রম শুরু করায় দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিল সম্প্রতি ঢাকা সফর করে যাওয়া আইএমএফ মিশন। আইএমএফের ঋণ ছাড়াও বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে এসেছে আরো প্রায় ৮০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ডিসেম্বর এসব সংস্থা ঋণ ছাড় দেড় বিলিয়ন ডলার। এসব অর্থ যুক্ত হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা বাড়বে।

আইএমএফের বরাদ্দকৃত ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়া না পাওয়া নিয়ে দারুণ অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়েছিল। আইএমএফের একটি চৌকশ দল তাদের বরাদ্দকৃত ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি অনুমোদনের আগে এ সংক্রান্ত শর্তাবলি সঠিকভাবে পরিপালন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাদের পর্যবেক্ষণে অনেকগুলো ঘাটতি, ত্রুটিবিচ্যুতি, সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয়েছিল। বেঁধে দেওয়া রিজার্ভ সঞ্চিতির পরিমাণ, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, সরকারি ভর্তুকি কমানো,ব্যাংক ব্যবস্থায় বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতি দূরীকরণে সংস্কার কার্যক্রম শুরু, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনাসহ সুদহার নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ে আইএমএফের প্রেসক্রিপশন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সবকিছু পরিপালন পরিচালনা অনেক কঠিন। ফলে আইএমএফের শর্ত পূরণ অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তেমন অবস্থায় ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়া নিয়ে দারুণ অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। কিছুদিন আগে বেঁধে দেওয়া শর্ত পরিপালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলঙ্কার ঋণের কিস্তি আটকে দেওয়া হয়েছিল। মূল্যস্ফীতির হার কমে আসায় শ্রীলঙ্কানীতি সুদহার ১০০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে দেওয়ায় শ্রীলঙ্কাকে ঋণের কিস্তি আটকে দেয় সংস্থাটি।  বাংলাদেশকেও কি শ্রীলঙ্কার পরিণতি বরণ করতে হয় কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল। আমাদের সৌভাগ্য বলা যায়, বিভিন্ন শর্ত পূরণে ব্যর্থতা, অন্যান্য সীমাবদ্ধতা, ত্রুটিবিচ্যুতিগুলোর নেপথ্য কারণ সম্পর্কে তাদের বোঝানোর চেষ্টায় সফল হয়েছে বাংলাদেশ। আইএমএফ পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকটা ছাড় দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের জন্য ঋণের শর্ত কিছুটা শিথিল করছে। ফলে পাওয়া গেছে দ্বিতীয় কিস্তি। আইএমএফ বলছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ এখন কম। তবে আশা করা যায়, স্বল্পমেয়াদে ধারাবাহিকভাবে তা বাড়বে। মধ্য মেয়াদে চার মাসের আমদানির সমপরিমাণও থাকবে এ রিজার্ভ। তবে সংস্থাটি মনে করে, বাংলাদেশের সামনে আছে উচ্চ মাত্রার অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি। তারা বলেছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে বাংলাদেশকে একদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দক্ষতা আনতে হবে খরচ করার ক্ষেত্রে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে যে চাপ পড়েছে সাধারণ জনগণের ওপর, তা মোকাবিলায় অধিকতর মনোযোগী হতে হবে বাংলাদেশকে। শুধু তা-ই নয়, ক্রমবর্ধমান অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা মোকাবিলা করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানো, পুরো ব্যাংক খাতে তদারকব্যবস্থা বৃদ্ধি ও সুশাসনব্যবস্থা জোরদার করলে আর্থিক খাতের দক্ষতা বাড়বে। আর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজারের উন্নয়নও জরুরি।

ঋণের জন্য আইএমএফ যেসব শর্ত দিয়েছিল, তার মধ্যে বেশ কয়েকটি পূরণ হয়েছে। তবে রিজার্ভ ও রাজস্ব আহরণের শর্ত পূরণ হয়নি। এর পেছনে দেশীয় ও বৈশ্বিক যেসব কারণ আছে, সেগুলো আইএমএফের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এর পরই ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জন্য ঋণ অনুমোদনের সময় আইএমএফ সময়ভিত্তিক কিছু লক্ষ্য দিয়েছিল বাংলাদেশকে। সরকারের দিক থেকে আইএমএফের দলকে শর্ত পূরণ করতে না পারার কিছু কারণ তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের দিক থেকে বলা হয়েছে, আগামী জানুয়ারিতে যেহেতু বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ফলে এ সময়ের মধ্যে লক্ষ্যগুলো অর্জন করার বাস্তবতা নেই। একটু কমিয়ে আগামী জুন পর্যন্ত নতুন লক্ষ্যমাত্রা চাইলে আইএমএফ তাতে সম্মতি প্রকাশ করেছে। স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন বিষয় আমলে নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে মুদ্রানীতির রাশ টেনে ধরার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এর সঙ্গে সহায়ক নীতি হিসেবে নিরপেক্ষ রাজস্বনীতি ও মুদ্রার বিনিময় মূল্যের ক্ষেত্রে আরো নমনীয় হওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি। বাইরের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে এসব পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। মুদ্রানীতির কাঠামো আরো আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে আইএমএফ। মুদ্রানীতি আধুনিক হলে তার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির প্রভাব জোরদার হবে। মুদ্রার একক বিনিময় হার গ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে আইএমএফ ধাপে ধাপে আরো নমনীয় হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। তারা মনে করে, অর্থনীতির বহিস্থ ধাক্কা মোকাবিলায় এটি জরুরি। বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের পর দেশের অর্থনীতির মূল্যায়ন করে সংস্থাটি যে বিবৃতি দিয়েছে, সেখানে তারা এসব কথা বলেছে। বর্ধিত ঋণসহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) ও রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ)—এ তিনটি ভাগে ঋণ দিচ্ছে আইএমএফ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ছয় শতাংশ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে, পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমতির দিকে থাকলেও রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। কঠোর মুদ্রানীতি ও নিরপেক্ষ রাজস্বনীতির কল্যাণে মূল্যস্ফীতির হার আগামী অর্থবছরের শেষ নাগাদ ৭.২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। রাজস্বঘাটতি জিডিপির ৪.৬ শতাংশের মধ্যে থাকবে। আইএমএফ মনে করে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধি সহায়ক বিনিয়োগ জরুরি। করনীতি সংশোধন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কর-রাজস্ব বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছে সংস্থাটি। ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ, ব্যয় করার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আরো দক্ষতার সঙ্গে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্ব দিয়েছে তারা। উন্নয়নের জন্য দেশে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এ বাস্তবতায় আইএমএফ মনে করে, আর্থিক খাতের সংস্কার জরুরি। ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি পুঁজি পুনরুদ্ধারে বিশেষ কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। পরিচালকেরা এ বিষয়ে একমত যে ব্যাংক খাতের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো জোরদার করা, শাসনব্যবস্থার উন্নতি ও দেশীয় পুঁজিবাজারের উন্নয়ন করা গেলে আর্থিক খাতের দক্ষতা বাড়বে এবং উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে আইএমএফের বরাদ্দকৃত ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ পাওয়া নিয়ে চারপাশে নানা গুজব, গুঞ্জন ছড়িয়েছিল একটি মহল। তা শেষ পর্যন্ত মিথ্যে এবং ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হলো।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

ইত্তেফাক/এএইচপি