বিজয়ের ধারা

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:০০

১৬ ডিসেম্বর আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ নামক একটি নতুন মানচিত্রের অভ্যুদয় ঘটে। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার জায়গায় হর্ষ-বেদনার ছাপ ফুটে ওঠে। বিজয়ী জাতি হিসেবে গর্ববোধ যেমন ছিল, তেমনি আত্মীয়স্বজন পরিজন হারানোর বেদনাও ছিল। ১৯৭১-এর যুদ্ধ বিজয়ের ক্ষণে আমাদের প্রিয় নেতা তখনো ফিরে আসেননি আমাদের মধ্যে। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মিয়ানওয়ালি কারাগারে এক নির্জন কক্ষে তিনি বন্দি ছিলেন। সামরিক ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার ফাঁসির জন্যে একটি বিশেষ রশিও প্রস্তুত করা হয়েছিল। অবশেষে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আরী ভুট্টোর নির্দেশে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে। মূলত, সেদিন আমাদের বিজয়ের পূর্ণতা আসে। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শাসনভার কাঁধে নেন। বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে তিনি কাজ শুরু করেন। সোনার বাংলা গড়ে তুলতে নানামুখী কর্মসূচি হাতে নেন। কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে যেমন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু দেশ পরিচালনা করতে দরকার একটি সংবিধান। স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি দেশের সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধানে মহত্ আদর্শগুলোর প্রতি নৈর্ব্যক্তিক আনুগত্য প্রকাশে দেশবাসীকে উদাত্ত আহ্বান জানান। দেশপ্রেমিক মানুষ তার ডাকে সাড়া দিলেও কুচক্রী মহল পাকিস্তানপন্থি দেশবিরোধীরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে থাকে। দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে আঁতাত করে আন্তর্জাতিক একটি মহল বঙ্গবন্ধুকে আঘাত করার পরিকল্পনায় মেতে উঠে। আমাদের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করার চক্রান্তে লিপ্ত থাকেন। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন, তিনি সব ষড়যন্ত্রের মোকাবিলার লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিয়ে গড়ে তোলেন বাকশাল। যদিও বাকশাল গঠন ছিল তার সাময়িক পদক্ষেপ। রাজনৈতিক হানাহানি, অস্থিরতা দূরীকরণে তার নতুন পদক্ষেপকে অনেকেই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত মনে করলেও সময়ের প্রয়োজনে তিনি বিকল্প পদক্ষেপটি গ্রহণ করেন। দেশকে সুশাসন ও জাতির অগ্রগতির পথকে প্রশস্ত করতে তিনি বেছে নেন বিকল্প পথটি। 

কিন্তু দুর্ভাগ্য ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয় সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যদের। সৌভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বেঁচে যান বিদেশে অবস্থানের কারণে। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বাঙালি জাতির প্রতিকূলে। দেশের স্বাধীন শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলে পাকিস্তানি আমলের পরাধীন শাসনব্যবস্থা প্রণীত হয়। বাঙালি আবার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। সেই অন্ধকারের দীর্ঘকালের ইতিহাস বড়ই হূদয়বিদারক। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির দুর্দশা মোচনে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। বিপন্ন জীবনকালেও সাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। বাঙালি জাতির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সংগ্রামী জীবন বেছে নেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নানারকম নির্যাতনের শিকার হন। তার নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞায় স্বৈরশাসনের বিদায় ঘটে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। দেশে প্রাণের জোয়ার বয়ে যায়। সেদিন যেন বিজয়েরই পুনরাবৃত্তি ঘটে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার দ্বার উন্মোচন করেন। তার আমলেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। রায় বাস্তবায়নের আগেই আবার ষড়যন্ত্রের কবলে পড়েন। ১৯৯৬-এর ১২ জুন থেকে পাঁচ বছর দেশে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, ইতিহাসের পাতায় তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। উল্লেখ করতে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার স্বাভাবিক নিয়মে আইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

২০০১ সালে ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল অস্বচ্ছ। সেই সরকারের অভ্যন্তরে চলছিল ষড়যন্ত্র। আওয়ামী লীগ কাস্টিং ভোটের শতকরা ৪০.১৩ শতাংশ ভোট পেয়েও আসন পায় মাত্র ৬২টি। অন্যদিক জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ৪০.৯৭স শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পায় ১৯৩টি। বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পেলেও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামায়াতে ইসলামকে সহযোগী করে জামায়াত নেতাদের মন্ত্রী বানিয়ে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা তুলে দেয় তাদের গাড়িতে। তারপর আরেক ইতিহাস সৃষ্টি হয়। গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা দেশকে উদ্ধার করতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাকে পুনরুদ্ধার করেন। টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। শেখ হাসিনার বিচক্ষণতার কারণে আওয়ামী লীগ টানা তিন দফা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। দেশকে উন্নয়নশীল অগ্রগতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনিই গণতান্ত্রিক আহ্বানের সামনাসামনি হয়ে অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছেন। উদার ও গভীর মানবিক ভাবধারার পথে চলার নেত্রী তিনি। প্রগতিশীল মানব সমাজ গড়ে তুলতে হলে অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতেই হবে। শেখ হাসিনার শাসনকালে আমরা যেভাবে বিজয় উদ্যাপন করতে পারছি, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ক্ষমতায় থাকলে কী সেটা পারতাম?

লেখক: রাজনীতিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য

ইত্তেফাক/এএইচপি