সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়

আপডেট : ০১ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৪

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হইতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উপহার দেওয়া একতলা দুইটি বাস গত তিন-চার বত্সর যাবত্ গাছতলায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত ছবিটিতে দেখা যায়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন সংলগ্ন প্রাশাসনিক ভবনের পিছনে এবং কাঁঠালতলার বোটানিক্যাল গার্ডেনের পার্শ্বে বাস দুইটি পড়িয়া রহিয়াছে অযত্ন-অবহেলায়। দীর্ঘদিন ধরিয়া এই অবস্থায় থাকায় বাসের ভিতরে জন্ম নিয়াছে লতাপাতা-ঘাস-গুল্ম। এই জীবন্ত লতাপাতাগুলিই বলিয়া দিতেছে বাস দুইটির দুর্গতির কথা। ইহার অনেক যন্ত্রাংশ ইতোমধ্যে চুরি হইয়া গিয়াছে। নষ্ট হইয়া গিয়াছে বাসের দরজা, জানালা, বসার সিট ও টায়ার। উঠিয়া গিয়াছে বহিরাংশের রং। জানা গিয়াছে, ২০১৪ সালে বাস দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহন পুলে যুক্ত হইবার মাত্র দুই বত্সরের মাথায় তাহার ইঞ্জিন নষ্ট হইয়া যায়। সেই সময় বাসটি মেরামত করা হইলে শুধু ইঞ্জিন পরিবর্তন করিলেই চলিত। খরচ হইত পাঁচ লক্ষ টাকা। এখন বাস দুইটি মেরামত করিতে খরচ হইবে অন্তত ৩২ লক্ষ টাকা। মেরামতে অবহেলার কারণে এখন একটি বাসের প্রায় ক্রয়মূল্যের সমান খরচ পড়িবে। ইহাকেই বলে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়’। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে আসলে ঝামেলার কোনো সীমা থাকে না।

চীনা নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের আওতায় এই ধরনের বাস দেওয়া হয় বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু যতদূর জানা যায়, সেইসব বিশ্ববিদ্যালয়েও একই রকম সমস্যা বিরাজমান। এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মারাত্মক পরিবহন সংকট রহিয়াছে। তাহার পরও পুলে থাকা মেরামতযোগ্য বাসগুলি যথাসময়ে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হইতেছে না। তাহার চাইতে বড়ো প্রশ্ন হইল, অনুদান বা ঋণের টাকায় ক্রয় করা বাস কেন দ্রুত নষ্ট হইয়া যাইবে? এই অবহেলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরকে এবং সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কেন দায়ী করা হইবে না? ইঞ্জিনসহ সিংহভাগ যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের দায় কি এখন তাহারা এড়াইতে পারিবেন? ইহা কি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নহে? সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন বা বিআরটিসির ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। বর্তমানে এই সংস্থার অধীনে রহিয়াছে ১ হাজার ৪৪৫টি বাস। তন্মধ্যে অকেজো অবস্থায় ডিপোতে পড়িয়া রহিয়াছে ৫২৪টি বাস। ইহার মধ্যে ৩৬০টি বাসের বড়ো ধরনের মেরামত করা প্রয়োজন। এখানেও দেখা যাইতেছে, যেসব বাস ১০ বত্সর ধরিয়া সচল থাকিবার কথা, তাহা মাত্র পাঁচ বত্সরেই বিকল হইয়া পড়িতেছে। এইভাবে বত্সরের পর বত্সর লোকসান গুনিয়া আসিতেছে বিআরটিসি। অনেক ক্ষেত্রে বিআরটিসি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করিতে না পারিয়া বাসের মালিকানাও হারাইতেছে।

বেসরকারি কোম্পানিগুলি একটি বাস ২০ বত্সর ধরিয়া রাস্তায় চালাইতে পারিলেও সরকারি বিভিন্ন সংস্থা কেন তাহা দুই বা পাঁচ বত্সরও চালাইতে পারিতেছে না? প্রকৃতপক্ষে পর্যাপ্ত টেকনেশিয়ান, প্রয়োজনীয় মেরামত খরচ ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতার অভাবে নষ্ট হওয়া গাড়িগুলো আর রাস্তায় ফিরিতেছে না। বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিও ইহার জন্য দায়ী। ইহাতে সরকার কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনিয়া যাইতেছে এবং যাত্রীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাইতেছে না। এইজন্য বাস কেনার আগে সংশ্লিষ্ট মহলের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাস ক্রয় করার পর প্রয়োজন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্নীতি ও অনিয়ম দূরীকরণ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন।