রহিমা আক্তার মৌ
১৯৯১ সালে ঢাকায় আসার পর থেকেই সাভারের সাথে আমার একটা সম্পর্ক। কলেজ ছুটি পেলেই বাবা নিয়ে যেতেন বেড়াতে। ১৯৯৪ সালে বিয়ের পর সাভারেই বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার শুরু করি। ২০০০ সালে ঢাকায় চলে এলেও সাভারে যাওয়া হয় সব সময়, কারণ ১৯৯৫ সাল থেকে বাবা-মা আছেন সাভারে। সেই ২৭-২৮ বছর ধরে যাওয়া-আসার সময় বাসে বা ব্যক্তিগত গাড়িতে জানালার পাশেই বসি আমি। রাস্তার দুই পাশে পানি সবুজ আর খোলা বাতাস। কিন্তু দিনের পর দিন কমে গেছে পানি, হারিয়ে গেছে সবুজ অরণ্য আর খোলা বাতাস এখন পুরোই দূষিত বাতাস। অর্ধেক পথ নাকে কাপড় দিয়ে যেতে হয়। প্রায় শুনি বাতাস দূষিত হয়ে যাচ্ছে। ইট খোলার ইট পোড়ার কালো ধোঁয়া যেন আকাশজুড়ে কালো মেঘ।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্যি যে, মেগাসিটি রাজধানী ঢাকা শহরের চেয়ে সাভারের বায়ু বেশি দূষিত। গত শনিবার (১৫ জুন) পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান মানমাত্রা মনিটরিং স্টেশন সূত্রে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য। ঢাকা শহরে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (বায়ুমান মানমাত্রা) ১১৫ হলেও সাভারে এর পরিমাণ ১৩৫। ঢাকার চেয়ে আরো বেশি বায়ুদূষণকারী শহর রংপুর। এ শহরে বায়ুমান মানমাত্রা ১২৮। বায়ুমানের হিসাবে রাজধানী ঢাকা, সাভার এবং রংপুর শহরে স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের স্থান সাবধানতা/সতর্কীকরণ লেবেলে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ মধ্যম। স্বাস্থ্য উদ্বেগ সবচেয়ে কম কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ। এ ছাড়া স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ কমের শহরের মধ্যে চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল।
স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ বিবেচনায় বায়ুমান মাত্রার পরিমাণ শূন্য থেকে ৫০ হলে ভালো, ৫১ থেকে ১০০ হলে মধ্যম, ১০১ থেকে ১৫০ হলে সাবধানতা/সতর্কীকরণ, ১৫১ থেকে ২০০ হলে অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুব অস্বাস্থ্যকর ও ৩০১ থেকে ৫০০ পর্যন্ত অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচনা করা হয়।
বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড, লেড, নাইট্রোজেন অক্সইড ও প্রলম্বিত বস্তু কণার কারণে বায়ুদূষিত হয়। পরিবেশ অধিদফতরে তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন শহরের মধ্যে বায়ুমান মানমাত্রা চট্টগ্রামে ৩৫, গাজীপুর ৮৩, নারায়ণগঞ্জ ৮৫, সিলেট ৩৯, বরিশাল ৩৯, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা ২৭। দূষক প্যারামিটার পিএম ২ দশমিক ৫ ধরে এ হিসাব করা হয়। দূষিত বাতাস বলতে বোঝায় যখন বায়ুতে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থের কণা ও ক্ষুদ্র অণু অধিক অনুপাতে মিশে যায়। তখন এটি মানুষের বিভিন্ন রোগ , অ্যালার্জি এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এটা অন্যান্য জীবন্ত বস্তু যেমন : পশুপাখি, ফসল প্রভৃতির ক্ষতি করে। দূষিত বায়ু সুস্থ পরিবেশের জন্য বাধা। ২০১৪ সালের WHO এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১২ সালে বায়ুদূষণে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে ।
চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটি এবং আমেরিকার ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক বায়ুদূষণ ও মানুষের বুদ্ধি বিকাশের ওপর একটা গবেষণা করেন। তাতে উঠে আসে তীব্র বায়ুদূষণের সাথে মানুষের বুদ্ধি কমে যায়। নতুন এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে চীনে। চার বছর ধরে চীনের ২০ হাজার মানুষের ওপর এক গবেষণা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন, তাদের যৌথ গবেষণার মাধ্যমে। গবেষকরা মনে করেন, এ গবেষণাটি বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিক। বিশ্বজুড়ে শহরাঞ্চলের ৮০ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করছে। বায়ুদূষণের শিকার ব্যক্তিদের গণিত এবং মৌখিক কিছু পরীক্ষা দেয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের বুদ্ধিমত্তা যাচাই করা। গবেষকরা দেখেছেন যে, যারা বায়ুদূষণের শিকার তারা পরীক্ষায় ভালো করতে পারেনি। এ গবেষণায় তারা বায়ুতে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এবং ১০ মাইক্রোমিটারের ছোট ধূলিকণা পরিমাপ করেছেন। তবে কার্বন মনোক্সাইড, ওজন এবং বড় ধরনের কণাগুলো এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। (তথ্যসূত্র, ২৮ আগষ্ট ২০১৮, বিবিসি নিউজ, বাংলা)
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত।
‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লি। ঢাকার পরেই রয়েছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। আর এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। এত দিন এই উপাদান সবচেয়ে বেশি নির্গত করত চীন। গত দুই বছরে চীনকে টপকে ওই দূষণকারী স্থানটি দখল করে নিয়েছে ভারত। চীন ও ভারতের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে জাপানের টোকিও শহর। প্রতিবেদনটিতে মূলত কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বায়ুদূষণের পরিমাণ পরিমাপ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। আর বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। পিএম ২.৫ ছাড়াও বায়ুর অন্যান্য দূষণকারী পদার্থের উপস্থিতির দিক থেকে সামগ্রিক দূষণের একটি চিত্র ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে শীর্ষ বায়ুদূষণকারী দেশ হিসেবে চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। (তথ্যসূত্র, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, দৈনিক প্রথম আলো) তবে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি মানতে নারাজ পরিবেশ অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলছেন, বায়ুদুষণের ফলে মানুষের শ্বাসযন্ত্র, হূদরোগ, ক্যানসার ও ডায়াবেটিস বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া বাযুদূষণ মাতৃগর্ভে ভ্রূণের ক্ষতিসাধনসহ শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশ ব্যাহত করে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, ইটভাটাগুলো দ্রুত আধুনিকায়ন করতে হবে। নির্মাণকাজে যাতে ধুলা কম হয়, সে জন্য দেশের প্রচলিত আইন মানলেই যথেষ্ট। কিন্তু তা মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তদারকির ঘাটতি রয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে ওই তদারকি বাড়াতে হবে। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে যেসব কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে বায়ুদূষণ রয়েছে পঞ্চম স্থানে।
n লেখক :প্রাবন্ধিক
