অ্যান্টিবায়োটিক হইল এক অর্থে ‘মিরাকল ড্রাগ’। ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ বত্সর পূর্বে স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং দৈবক্রমে যখন ‘পেনিসিলিন’ নামক অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন, তখন হইতেই চিকিৎসাবিজ্ঞান এক লাফে জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দেওয়াল গড়িয়া তুলিতে সক্ষম হয়; কিন্তু গত কয়েক দশকে নূতন নূতন জীবাণুকে প্রতিহত করিতে যত অধিক শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা হইতেছে ততই বৃদ্ধি পাইতেছে ঔষধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা, ঔষধ প্রশাসন, আইসিডিডিআরবি, গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ও দ্য সেন্টার ফর ডিজিজ ডিনামিকস, ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিসির একটি যৌথ প্রতিবেদনে জানানো হইয়াছে যে, বাংলাদেশে প্রচণ্ড শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডায়রিয়াজনিত রোগ, যক্ষ্মা, মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ, কানের রোগ, টাইফয়েড, ত্বকের সংক্রমণ, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, গনোরিয়া, সিফিলিসের চিকিৎসায় বেশ কিছু অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হইয়া পড়িয়াছে। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অর্ধেকের অধিক অ্যান্টিবায়োটিকই ভুলভাবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিকূল পরিবেশে টিকিয়া থাকিবার জন্য প্রতিটি জীবসত্তা সাধ্যানুযায়ী নিজেকে বিবর্তিত করিয়া থাকে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়াছেন, ঔষধ প্রতিরোধী হইয়া উঠিবার সহজাত ক্ষমতা রহিয়াছে জীবাণুদের মধ্যে। আবার কিছু জীবাণু বৈরী পরিবেশে নিজেকে রূপান্তরিত করিয়া লয়। এমনকি কিছু জীবাণু নিজেদের কোষ হইতে তাহাকে সংহারকারী রসায়নটিকে বাহির করিয়া দিতে পারে। দেখা গিয়াছে যে, ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ও ভুল ব্যবহারে নির্দিষ্ট জীবাণুটি ক্রমশ অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হইয়া উঠে। অত্যন্ত উদ্বেগের কথা হইল, মানুষের শরীরে সংক্রমণ সৃষ্টিকারী প্রধান জীবাণুগুলির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ব্যবহূত প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় ৯০ শতাংশ অকার্যকর হইয়া পড়িয়াছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার ইহার প্রথম ও প্রধান কারণ। ২০২২ সালের জানুয়ারি হইতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসা লইতে যাওয়া ৭২ হাজার ৬৭০ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করিয়া এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হইয়াছে। গত সোমবার বিএসএমএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘সংক্রামক ব্যাধি চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও কার্যকারিতার চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফলে এই তথ্য তুলিয়া ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বিএসএমএমইউর মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশে অন্তত ৭৫ শতাংশ ইনফেকশন হয় টাইফয়েড, ই-কোলাই, স্ট্যাফাউরিয়াস, ক্লিবশিয়েলা ও সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে। এই সকল ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাকসেস ও ওয়াচ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় ৯০ শতাংশ অকেজো হইয়া গিয়াছে। ইহা ছাড়া আইসিইউয়ের রোগীদের যেই অ্যান্টিবায়োটিকে চিকিৎসা চলিত, তাহা এখন ওয়ার্ডের রোগীকেও দিতে হইতেছে। ইহাতে বোঝা যায়—পরিস্থিতি কতটা খারাপের দিকে যাইতেছে। ইহার সহিত যেই সকল জীবাণু ইতিপূর্বে শুধু আইসিইউতে মিলিত সেইগুলি এখন কমিউনিটিতেও খুঁজে পাওয়া যাইতেছে বলিয়া গবেষণায় উল্লেখ করা হইতেছে। আরো বলা হইয়াছে, দেশে প্রতি বত্সর ১ লাখ ৭০ হাজার লোক মারা যাইতেছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে। এই জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়াছেন, যাহারা হাসপাতালে যাইবেন রোগী দেখিতে, তাহারা একটু দূরে থাকিয়া রোগী দেখিবেন। কারণ, অনেক সময় দেখা যায়, রোগীকে দেখিতে হাসপাতালে গিয়া সাধারণ মানুষও রোগী হইয়া যায়। ইহাকে ক্রস ইনফেকশন বলে। এই জন্য হাসপাতালে গেলেও দ্রুত সেইখান হইতে চলিয়া আসিতে হইবে। চিকিত্সকের পরামর্শ ব্যতীত নিজে নিজে বা ঔষধের দোকানদারের পরামর্শে কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক ক্রয় করা যাইবে না। ইহা আত্মঘাতী প্রবণতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারকে বিধিবদ্ধ করিবার যেই সকল দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করিয়া দিয়াছে, তাহা যথাযথভাবে মানিয়া চলিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার এই সময়কালকে অ্যান্টিবায়োটিকের যুগ বলা হয়। এই যুগটি যে সাফল্য আনিয়াছে, তাহা হারাইবার ক্ষতি সহ্য করিবার সামর্থ্য মানবসভ্যতার নাই।
