মহাদার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘শান্তিতে বাস করার জন্যই আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হই।’ কিন্তু নেপোলিয়নের অবস্থান ছিল এই কথার ঠিক বিপরীতে, তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ হলো বর্বরদের ব্যবসা।’ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, মহাদেশ, উপমহাদেশ এবং সর্বোপরি বিশ্বের চারদিকে শুধু যুদ্ধবিগ্রহের দামামা।
দিগন্তবিস্তৃত আকাশের কোনো সীমারেখা বা সীমাবদ্ধতা না থাকলেও মনুষ্যনির্মিত পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অথবা এই বিশ্বব্যবস্থা একটা নির্দিষ্ট সীমানা ও সীমারেখা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি বিশ্বব্যবস্থার রয়েছে সীমাবদ্ধতা। একটি পরিবার নির্দিষ্ট কয়েক জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাদের মধ্যে স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক কিছুই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে।
অনেকগুলো পরিবার নিয়ে অথবা একটা গোত্র নিয়ে যে সমাজ সেই সমাজে প্রতিনিয়ত নেতৃত্ব, দলাদলি, কোন্দল, হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার এবং পরনিন্দা চলতে থাকে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের মতো। ফলে প্রতিটি সমাজে, সমাজের গোত্রে, গোত্রের ছোট দল, উপদল সবার মধ্যে বিভেদ ও ভাঙনের সৃষ্টি হয়। সেখানে আবার ঘটে মধ্যস্থতাকারীর আগমন! মধ্যস্থতাকারীর নিজের স্বার্থরক্ষা, হিসাবের মিল, অমিল, গরমিল সবকিছু মিলে সামনের পথ চলা সুগম হতে পারে অথবা দুর্গমও হতে পারে। লোকাল রাজনীতিতে এগুলোকে ধান্ধাবাজের কূটচাল বললেও রাষ্ট্রনীতির পরিভাষায় একে আমরা কূটনীতি বলে থাকি।
অ্যারিস্টটল আবার এটাও বলেছেন যে, ‘মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব এবং যে সমাজে বাস করে না সে হয় পশু, না হয় দেবতা।’ অতি সাধারণভাবে চিন্তা করলেও যারা সমাজের সমস্যার কারণ অথবা সমস্যার জন্য দায়ী তাদেরকে আমরা জানোয়ার বলি। কিন্তু খালি চোখে দেখলে প্রত্যেকে শান্তি চায়, প্রত্যেকে প্রত্যেককে কন্ট্রোল করতে চায়, প্রত্যেকে প্রত্যেকের জ্ঞানকে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায় নিজের স্বার্থ সঞ্চিত রেখেই।
অ্যারিস্টটলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা রাজনীতিবিজ্ঞানের জনক বলা হয় কারণ, রাজনীতির বিষয়ে তিনিই প্রথম স্বতন্ত্র একটা ভিত তৈরি করতে পেরেছিলেন। তিনি যেমন দার্শনিক প্লেটোর ছাত্র ছিলেন, তেমনি ছিলেন মহাবীর আলেকজান্ডারের গৃহশিক্ষক। বর্তমানকালে অনলাইন কমিউনিকেশনের সময়ে অথবা ইন্টারনেটের যুগে যার যার জায়গা থেকে সবাই মাতব্বর। কিন্তু একবার ভাবুন তো, খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে যখন জ্ঞানবিজ্ঞানে পৃথিবীর মানুষ তেমন অগ্রসরমাণ ছিল না, ঠিক সেই সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি নিয়ে অ্যারিস্টটলের চিন্তা ও চেতনা সম্পর্কে! বর্তমান প্রেক্ষাপটেও অ্যারিস্টটলের চিন্তাশক্তির যে বিশাল অবদান এবং ভূমিকা, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। অ্যারিস্টটল কর্তৃক সরকারের শ্রেণিবিন্যাসসহ দাসতত্ত্ব ও বিপ্লবতত্ত্বের গভীরে যদি আমরা আলোকপাত করি, তাহলেই বর্তমান ফ্যাসিবাদ পূর্ণসমাজ ব্যবস্থার অনেক উপকরণ সম্পর্কে খুঁজে পাই।
খ্রিষ্টপূর্ব সময়ও মানুষ সমাজে মিলেমিশে বসবাস করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। শুধু আমাদের বাংলার কথা যদি বলি, এখানেও খ্রিষ্টপূর্ব ১০ হাজার বছরেরও পূর্ব থেকে মানুষের বসবাস শুরু হয়েছিল। তখনকার প্রাচীন বাংলায় কোম বা গোত্র হচ্ছে সংগঠিত প্রথম কোনো দলবদ্ধ সমাজ। বিভিন্ন গোষ্ঠীর আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোম সমাজ বা জীবনব্যবস্থা গড়ে গড়ে উঠেছিল।
খ্রিষ্ট্রপূর্ব অথবা খ্রিস্ট পরবর্তী সময়ে সমাজ ব্যবস্থার যে পরিবর্তন সময়ের চাহিদার আলোকে হয়েছিল, সেটারই সর্বাধুনিক যুগে আমাদের বর্তমান মানব সভ্যতা। অতি আধুনিক যুগের বিজ্ঞান এবং ইন্টারনেটের যুগে বাস করেও আমরা কি খ্রিষ্টপূর্ব আদিম সমাজের লাঠিয়াল মানসিকতাকে পরিহার করতে পেরেছি? কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয় তো পেরেছি! কিন্তু অনেকাংশে পারিনি! তখনকার দিনে লাঠিয়াল বাহিনী ছিল যে কোনো সমাজের বা গোত্রের টিকে থাকার প্রথম হাতিয়ার! সেজন্যই দলে দলে, গোত্রে গোত্রে মারামারি, যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। মজার ব্যাপার হলো, আজকের দিনে সেই লাঠিয়ালির কাজটি হচ্ছে প্রযুক্তির ভেতর দিয়েও!
পৃথিবীর তাবত্ ছোট কিংবা বড় সব কর্ম প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা মহল তাদের সীমানা এবং বলয় ঠিক রেখে বা রাখার জন্য তৈরি করে এবং সেই অনুযায়ী নিজের ক্ষমতা খাটিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বব্যবস্থাকে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। এরাই মোড়ল নামে পরিচিত। পরিবারের মোড়ল, সমাজ বা গোত্রের মোড়ল, রাষ্ট্র অথবা বিশ্ব মোড়ল যাই বলি না কেন, এদের প্রায় সবারই প্রথম এবং প্রধানতম উপলক্ষ্য হলো সন্ত্রাস কায়েম করা। উদ্দেশ্য, মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজের মাতব্বরিকে পাকাপোক্ত করে নেতৃত্বের আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। সমাজ, গোত্রের, রাষ্ট্রের মতো পৃথিবীর মোড়ল বা পরাশক্তিদের কাজও হলো দেশে দেশে ভেজাল লাগিয়ে রেখে নিজের মোড়লিপনাকে জিইয়ে রাখা।
নিজের স্বার্থের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখেই চাহিদার সীমানা নির্ধারণ করলেও, কখনো কখনো নিজের সীমানাকে অতিক্রম করে অন্যের সীমানায় হাত বাড়ায় মোড়লরা, আর সেখানেই ঘটে বিপত্তি। এক মোড়লের হাত যখন অন্য মোড়লের গায়ে লাগে, তখনই মোড়লে মোড়লে হাতাহাতি, পালটে যায় সমাজ, রাষ্ট্র অথবা বিশ্বব্যবস্থা রাতারাতি। পৃথিবীর ছোটবড় তাবত্ মোড়লই তাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে ছলে বলে কৌশলে নিজের সীমাবদ্ধতাকে, নিজের সীমানাকে অতিক্রম করে অন্যের স্বার্থকে বগলদাবা করে একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিকানা। এসব মোড়লের মনন ও মগজে নিজের সীমানা ও সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য কূটকৌশলগুলো টগবগ করতে থাকে। আবার টগবগ করা কূটকৌশলগুলো আশপাশের মোসাহেবি দালালদের তৈলমর্দনে সাধারণের মাথায় ফুটন্ত গরম তেল হয়ে নির্গত হয়। একজন ছোট অথবা বড় মোড়ল যতটা না ক্ষতিকারক তার চাইতে শতগুণ ক্ষতিকারক মোসাহেবি চাটুকার তৈলাক্ত বানরগুলো।
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে পরিবর্তন হয়নি কূটকৌশলে। এখানেও সেই স্বার্থের এবং স্বার্থবাদিতার নির্লজ্জতা! হাজারো লাখো মানুষের মধ্যে নোংরামি ছড়িয়ে দিয়ে আয়েশে অর্থ উপার্জন এখন প্রযুক্তি মোড়লদের নব্য ব্যবসা!
সেজন্যেই আলবার্ট আইনস্টাইন ভোগবাদ সম্পর্কে তার ‘আইডিয়াস অ্যান্ড ওপিনিয়নস’ গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘ভোগবাদ যে নৈতিক আদর্শের কাঠামো খাড়া করে তাকে আমি শূকরের খোঁয়াড় বলে অভিহিত করি। যেসব আদর্শ আমার জীবনপথে আলো জ্বালিয়েছে এবং আনন্দের সঙ্গে জীবন যাপনে সাহস জুগিয়েছে সেগুলো হলো—সহানুভূতি, সৌন্দর্য ও সত্য।’ যদিও ছোটকালে আইনস্টাইনকেই মানুষ মাথামোটা বলে উপাধি দিয়েছিল!
শুধু সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই কোনো মানুষের জ্ঞানের মাপকাঠি হতে পারে না। তেমনি অনেক উঁচু পদবিও তার জ্ঞানের ভান্ডারকে তুলে ধরে না। আসল কথা হলো, যারা শিক্ষিত কিন্তু সত্যকে মানেন না, তারাই মূর্খ! আবার যারা জেনেশুনে সত্যকে অস্বীকার করে, তারা তার চাইতেও বড় মূর্খ! মানুষ অনেকটা জবাবদিহিতা ও শাস্তির ভয়ে মূল্যবোধ লালন করে এবং নিজেকে সংযমে বাধ্য হয়। জবাবদিহিতা ও চাটুকারিতা যদি এক হয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে সেই সমাজে অপরাধের ভয়াবহতা তাদের এবং সভ্যতার জন্য মহা হুমকি।
লেখক:কবি ও প্রাবন্ধিক, এমহার্স্ট, নিউ ইয়র্ক
