এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রসঙ্গে

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৩০

এমপিওভুক্ত এমন কিছু শিক্ষক রহিয়াছেন, যাহারা দূরদূরান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন। বদলি প্রক্রিয়া না থাকায় তাহারা নিজ এলাকায় পরিবার-পরিজনের সহিত বসবাস করিতে পারেন না। আবার আর্থিক অসংগতির কারণে পরিবারকে কর্মস্থলের আশপাশে বাসা ভাড়া করিয়া রাখিতে পারেন না। তাই তাহাদের দাবি হইল, সরকারি চাকুরিতে বদলির সুযোগ থাকিলেও তাহাদের থাকিবে না কেন? তাহারা এই ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন মহলে দেনদরবার করিয়া আসিতেছেন। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক সংবাদ হইতে জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন এই বিষয়টি লইয়া ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করিতেছে। ইতিমধ্যে এই সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়াও তৈরি করা হইয়াছে। মন্ত্রণালয় চাহিতেছে তাহাদের বদলির প্রক্রিয়াটি শিগিগরই শুরু হউক। ইহাতে কিছু শিক্ষকের উপকার হইবে নিঃসন্দেহে; কিন্তু গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থায় তাহার কীরূপ নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে তাহাও আমলে লইয়া নীতিমালা চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।

আমরা বরাবরই লক্ষ করিয়া আসিতেছি যে, মফস্সল ও গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ সরকারি ডাক্তার-টেকনিশিয়ানরা থাকিতে চাহেন না। কেননা এই সকল প্রত্যন্ত অঞ্চলে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা কম। তাহা ছাড়া বাড়তি আয়-উপার্জনের সুযোগও অপ্রতুল। এই জন্য সকলেই শহরমুখী হইতে চাহেন। একবার যাহারা শহরমুখী হন, তাহাদের আবার গ্রামমুখী করা কঠিন হইয়া পড়ে। ইহাতে চিকিত্সাসংকট দেখা দেয়। অনুরূপভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এই বদলির সুযোগে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থায় নৈরাজ্যের সৃষ্টি হইতে পারে। ইহাতে গ্রামের গরিব-দুঃখীর সন্তানরা বঞ্চিত হইতে পারে উপযুক্ত ও মেধাবী শিক্ষকদের পাঠদান হইতে। আমাদের পর্যবেক্ষণ হইল, যখন কোনো স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ করা হয়, তখন সরকারি নিয়মে বদলির সুযোগ অবারিত থাকায় অনেক মেধাবী শিক্ষক তদবিরপূর্বক গ্রাম ছাড়িয়া শহরের নামিদামি স্কুলে বদলি হইয়া যান। সেইখানে প্রাইভেট-টিউশনির সম্ভাবনা অধিক বলিয়া তাহারা নির্দয়ভাবে এই কাজটি করেন। এমনকি এই জন্য ঘুষ প্রদানসহ নানা অনৈতিক পন্থাও অবলম্বন করেন। এখন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও যদি একই পথ অনুসরণ করেন, তাহা হইলে জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা কি তৈরি হইবে না?

আমাদের মূল কথা হইল, গ্রামগঞ্জে এমনিতেই শিক্ষাব্যবস্থার করুণ দশা, সেইখানে এই বদলিনীতি যেন হিতে বিপরীত না হয়। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে কিছুসংখ্যক শিক্ষকের এমন বদলির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতেই পারে; কিন্তু তাহাতে যেন বদলির হিড়িক পড়িয়া না যায় এবং নীতিমালার অপপ্রয়োগ না হয়, সেই দিকেও খেয়াল রাখিতে হইবে। খসড়া নীতিমালায় বলা হইয়াছে, বদলির কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকশূন্যতা সৃষ্টি করা যাইবে না। কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক পদের ৫০ শতাংশ শূন্য থাকিলে ঐ প্রতিষ্ঠান হইতে কাউকে বদলির আবেদন বিবেচনা করা হইবে না। ইহা ৪০ শতাংশে নামাইয়া আনা যাইতে পারে। অর্থাত্ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি ৪০ শতাংশ শিক্ষকও শূন্য থাকে, তাহা হইলেও বদলি করা সংগত হইবে না। ইহা ছাড়া বদলির সমগ্র প্রক্রিয়া অনলাইন ও সফটওয়্যার ভিত্তিক করা, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিংবডির অনাপত্তির আবশ্যকতা, চাকুরির দুই বত্সর পূর্ণ হওয়া, জীবনে মাত্র একবার বদলির সুযোগ দান, ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি ইত্যাদি নিয়মাবলিতে কাহারও আপত্তি থাকিবার কথা নহে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সরকার বেসরকারি সকল মাধ্যমিক, নিম্নমাধ্যমিক ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন প্রথমে ৮০ শতাংশে উন্নীত করে। পরবর্তী সময়ে শতভাগ ব্যয়ভার গ্রহণ করা হয়। এই পদক্ষেপটিই এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) নামে অভিহিত। শতভাগ মূল বেতন দেওয়া হইলেও এখনো এই সকল শিক্ষক সরকারি স্কুল-কলেজের সমকক্ষ বেতন-ভাতা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান না। এই জন্য এই সকল স্কুল সরকারিকরণের দাবিও করা হয় সময়ান্তরে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুবিধা সম্প্রসারিত হওয়ায়ই তাহারা এখন সরকারি শিক্ষকদের ন্যায় বদলির সুবিধাও দাবি করিতেছেন। মানুষের আসলে চাওয়া-পাওয়ার অন্ত নাই। তবে গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতাকে সম্মুখে রাখিয়া তাহাদের এই দাবি মিটাইতে হইবে। একান্ত প্রয়োজন না হইলে যথাসম্ভব বদলি নিরুত্সাহিত করাই বাঞ্ছনীয়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন