আমরা কতখানি দায়িত্বশীল হইতে শিখিয়াছি?

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৩০

ইহা ঠিক যে, মিথ্যা বলিবার সাময়িক কিছু সুবিধা রহিয়াছে; কিন্তু ইহার সবচাইতে বড় অসুবিধা হইল—ইহা স্লো পয়জনের মতো, ধীরে ধীরে সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করে। এই জন্য ইংরেজি প্রবাদেই বলা হইয়াছে—অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। কেন ‘অনেস্টি’ বেস্ট পলিসি—তাহা বুঝিতে ‘বুদ্ধিমান’ হইতে হয় না। অথচ আমাদের সমাজ এমনভাবে তৈরি হইয়াছে যে, এইখানে ‘সত্য’ বলাটাকে বোকামির লক্ষণ হিসাবে গণ্য করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীর ব্রিটিশ লেখক স্যামুয়েল রাওল্যান্ডও বলিয়াছিলেন, ‘ছোট এবং বোকারাই সাধারণত সত্য কথা বলিয়া থাকে।’ কিন্তু সততাই যদি সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা হয়, তাহা হইলে আমরা বরং বলিতে পারি—বোকারাই মিথ্যা বলে। মিথ্যার মাধ্যমে তাহারা তাত্ক্ষণিক লাভ করিবার সুযোগ খোঁজাটা নিতান্তই চাতুর্যতা। তবে বাঙালিরা তাত্ক্ষণিক লাভেই বিশ্বাসী। হাজার বত্সর পূর্বে ওমর খৈয়াম বলিয়াছিলেন—‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও/ বাকির খাতা শূন্য থাক/ দূরের বাদ্য লাভ কী শুনে/ মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।’ (কাজী নজরুল ইসলাম অনূদিত)। সুতরাং বাঙালি নগদ লাভে বিশ্বাসী। ইহা ভয়ংকর। বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকাইলে বিস্ময়ের সহিত লক্ষ করা যায়—তাহারা চোখের উপর চোখ রাখিয়াও মিথ্যা বলিতে দ্বিধা করে না। মিথ্যা বলিতে তাহাদের বুক এবং চোখের পাতা কাঁপে না। ‘লাই ডিটেক্টর’ দিয়া টেস্ট করাইলেও হয়তো দেখা যাইবে, বাঙালির মিথ্যা তাহাতে ধরা পড়িতেছে না। মিথ্যা বলিবার সময় তাহার হার্টবিট বাড়িতেছে না, গলা শুকাইতেছে না, কথা জড়াইতেছে না। কী অপূর্ব দক্ষতায় সত্যের মতো করিয়া মিথ্যা বলিতে পারে!

এই চাতুর্যতা কখনো একটি জাতির মঙ্গল আনিতে পারে না। কারণ, মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী যেই কার্যপ্রণালি নির্ধারিত হয়, তাহাতে বড় ভুল হয়। যিনি যেই পদের জন্য উপযুক্ত নহেন, তাহার উচিত নহে নিজেকে উপযুক্ত হিসাবে ‘ভান’ করা। যিনি যেই কাজ পারিবেন না, কেন তিনি মিথ্যার আশ্রয় লইয়া তাহা করিতে যাইবেন? মহান দার্শনিক সক্রেটিস বলিয়া গিয়াছেন—‘সত্যপ্রীতি বিজ্ঞতার লক্ষণ’; কিন্তু আমরা কয়জন ‘বিজ্ঞ’ হইতে চাই? বাঙালিরা সকল কিছু জানিয়া-শুনিয়াই চালাক হইতে চাহে। এই জন্য চাতুর্যতা তাহার রান্ধ্রে রন্ধ্রে। যদি সে ‘মিথ্যা’ না বলে, তাহা হইলে সে ‘অর্ধসত্য’ বলিবে, তবু সহজে ‘সত্য’ বলিবে না। বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন বলিয়াছেন—অর্ধসত্য কথা বলাটাও মিথ্যার নামান্তর। অনেকে অবশ্য মনে করেন, অর্ধসত্য মিথ্যার চাইতেও ভয়ংকর; কিন্তু কেন বাঙালির এত মিথ্যাপ্রীতি? মনস্তত্ত্ববিদরা বলিয়া থাকেন, মানুষের মনোবিকাশে শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্ব অপরিসীম। যেই শিশু বা কিশোর দেখিতেছে যে তাহার পিতা অনিয়ম-দুর্নীতি করিয়া অর্থের পাহাড় তৈরি করিতেছে, তাহার মধ্যে কী করিয়া নীতিবোধ তৈরি হইবে? অথচ আমাদের আদর্শলিপি কিংবা ধর্মগ্রন্থসমূহে সত্ পথে চলিবার এবং চুরি না করিবার অসংখ্য নীতিবাক্য রহিয়াছে। হজরত আলী (রা.) বলিয়াছেন, ‘যাহা সত্য নহে তাহা কখনো মুখে আনিও না। তাহা হইলে তোমার সত্য কথাকেও লোকে অসত্য বলিয়া মনে করিবে।’ দুর্নীতি কিংবা চুরি করা অর্থ তো হারাম। কোনো ব্যক্তি যদি হারাম কোনো বস্তুকে হারাম মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তাহা হইলে তাহার কবিরা গুনাহ হইবে। আবার যদি হারাম বস্তুকে হালাল মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তাহা হইলে পরিণতি হইবে আরো ভয়াবহ। আখিরাতে সরাসরি জাহান্নাম। এই কথা জানা থাকিলে কাহারা এবং কেন চুরি ও দুর্নীতি করে? মিথ্যার আশ্রয় লয়? আসলে সত্য কথা বলা মানে দায়িত্বশীলতা। অধিকাংশ বাঙালিই দায়িত্বশীল হইতে শিখে নাই। ইহা দুঃখজনক।

মিথ্যার আরো একটি বিপদ হইল—মিথ্যা বলিবার জন্য অনেক অধিক মানসিক শক্তি খরচ করিতে হয়। এই জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলিয়াছিলেন, ‘সফল মিথ্যুক হইবার জন্য কাহারোই পর্যাপ্ত স্মরণশক্তি নাই।’ যেইহেতু কাহারোই এমন স্মরণশক্তি নাই এবং মিথ্যা বলিবার এত শত বিপদ। সুতরাং সকল দিক দিয়াই সত্য বলাটাই উত্তম। এই জন্য মিথ্যাশ্রয়ীদের নিকট হইতে নগদ পাইলেই তাহা হাত পাতিয়া লইতে নাই। উহা আখেরে ক্ষতিরই কারণ হইবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন