চামড়া ও রাবার জোড়া লাগাতে আঠা বা গামের বহুল ব্যবহার হয়। শহরের অলি-গলি থেকে শুরু করে গ্রামের পাড়া-মহল্লার সব জায়গায় হার্ডওয়ারের দোকানগুলোতে এটি সহজলভ্য। ভয়ংকর বিষয় হলো, এই গাম দিয়ে নেশা করে মাদকাসক্তরা। তাদের কাছে এটি ‘ড্যান্ডি’ নামে পরিচিত। পলিথিনের মধ্যে ভরে শহরের পথেঘাটে, পার্কে, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, বস্তিতে প্রকাশ্যে ড্যান্ডি সেবন করতে দেখা যায় পথশিশু-কিশোরদের। শুধু গাম বা আঠাই না, জুতার কালিকেও মাদক হিসেবে সেবন করছে মাদকাসক্তরা।
ভয়াবহ বিষয় হলো, এ মরণ নেশায় আসক্ত হচ্ছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরাও। দামে কম, সহজলভ্য এবং আইনত নিষিদ্ধ পদার্থ হিসেবে স্বীকৃত না হওয়ায় গাম দিয়ে নেশা মহামারি আকার ধারণ করছে। পাগলা ঘোড়ার মতো শহর থেকে গ্রামের পাড়া মহল্লায় ছুটে চলছে এর বিস্তৃতি। শিশু-কিশোররা দল বেঁধে অগোচরে এ নেশায় আসক্ত হচ্ছে। দৈনন্দিন টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে এ মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে স্কুল পড়ুয়া শিশু-কিশোররাও। বাদ নেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণরাও। নেশার টাকা জোগাড় করতে তারা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে।
চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় ড্যান্ডি ‘গ্লু স্নিফিং’ বা বাংলায় ‘গ্লু গাম শুঁকা’ নামে পরিচিত। এতে টলুইন, বেনজিন, অ্যাসিটোন ও কার্বন ট্রাই ক্লোরাইড-এই চার ধরনের জৈব যৌগ থাকে। চিকিত্সকরা বলছেন, এই গাম উদ্বায়ী পদার্থ। যার বাষ্প শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে শ্বসনতন্ত্র হয়ে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। প্রথমে শরীরে আনন্দের শিহরন আর অনিয়ন্ত্রিত উন্মাদনা জাগায়। পরবর্তীতে তা দেহে এক শিথিলতার ভাব সৃষ্টি করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী সেবনে চরম আসক্তির সৃষ্টি হয়।
মেডিসিন ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. কফিল উদ্দিন চৌধুরী জানান, এ জাতীয় নেশায় আসক্তরা মনো-আচরণগত, শারীরিক ও সামাজিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। এছাড়া শরীরের শ্বসন, পরিপাক, স্নায়ু ও রক্ত সংবহনতন্ত্রের উপর এই প্রকার নেশার ক্ষতিকারক উপাদানসমূহ নানা বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ ধরনের নেশা করলে আক্রান্ত ব্যক্তির মাথা ঘোরা, চলাচলে অসংলগ্নতা, কথা জড়িয়ে আসা, হাঁটতে অসুবিধা, অবসাদ, হাত কাঁপা, চোখে ঝাঁপসা দেখা, ক্ষুধামন্দা, বমি বা বমি বমি ভাব, রক্ত বমি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। এমনকি নেশার অতিমাত্রায় শ্বসন ও হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে কিংবা শ্বাসরোধ বা দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুও ঘটতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত দুই দশক ধরে এই প্রকার নেশার প্রকোপ বেড়েই চলেছে। দেশের মোট মাদকসেবীর শতকরা ৪০ ভাগ শিশু-কিশোর, যার মধ্যে অধিকাংশ পথশিশু। এদের শতকরা ৮০ ভাগই মাদকসেবী এবং এদের মাদকাসক্তের শুরুটা ড্যান্ডি দিয়ে হয়। দোকান থেকে আঠা কিনে পলিথিনে ভরে প্রস্তুত করা হয়। পলিথিনে ঘষা দিলেই উদ্বায়ী পদার্থ গাম বাষ্প হয়ে গ্যাসের সৃষ্টি হয়। যা মুখ ও নাক লাগিয়ে ঘ্রাণ টেনে সেবন করে মাদকাসক্তরা। এ মাদক তৈরিতে খরচ হয় ২০-৪০ টাকা। ফলে এটি মাদকাসক্তদের কাছে সহজলভ্য।
কাওরান বাজারের এক দোকানদার বলেন, চামড়ার জুতার ছোল এবং রাবার জাতীয় জিনিসের জোড়া লাগানোর কাজে আঠা বা গাম ব্যবহার করা হয়। সচরাচর সবাই জুতার গাম নামেই চেনে। ক্রেতারা জুতার গাম চাইলে আমরা বের করে দেই। দাম ২০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। তবে কে কোন কাজে ব্যবহার করছে তা তো বলতে পারবো না। তবে নেশা হিসেবে ব্যবহার করে— তা শুনেছি। এজন্য পথশিশুরা চাইলে বিক্রি করি না।
এই আঠার ওপরে আইনি কোনো বাধানিষেধ না থাকায় এই নেশার ফাঁদে শিশু-কিশোররা প্রতিনিয়ত জড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, এ ধরনের নেশা আগে শহরের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে দেখা যেত। তবে এখন গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সঙ্গদোষ, সহজলভ্যতা এবং পদার্থটি ব্যবহারে আইনি বাধা না থাকায় নেশার বস্তু হিসেবে ব্যবহারে এর বিস্তৃতি বেড়েই চলছে। এছাড়া অপরাধী চক্র শিশুদের এ নেশায় আসক্ত করে নানা অপরাধমূলক কাজ করাতে ব্যবহার করছে।
