আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ১ হাজার ৮৯৬ জন প্রার্থীর প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়া সারা দেশে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শুরু হইয়াছে। এইবারের নির্বাচনে ২৭টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়া ১ হাজার ৮৯৫ জনের মতো প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতেছেন। গত ১৫ নভেম্বর নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার মধ্য দিয়া দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য নির্বাচনি বিধি কার্যকর হইয়াছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক প্রার্থী যাহাতে নির্বাচনি আচরণবিধি যাথযথভাবে পালন করিতে পারেন, তাহার জন্য নির্বাচনি মাঠে আট শতাধিক নির্বাহী হাকিম দায়িত্ব পালন করিতেছেন। ইহার পাশাপাশি রহিয়াছে ৩০০ নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম জারি করা নির্বাচনি বিধি বেশ কয়েক বার সংশোধন করা হইয়াছে। ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর দেওয়া প্রবিধানের সর্বশেষ সংশোধনীর উপর ভিত্তি করিয়া নির্বাচনি আচরণবিধিতে কী করা যাইবে এবং কী করা যাইবে না—তাহা স্পষ্ট করা হইয়াছে। সেইখানে বলা হইয়াছে, ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করিয়া বা কোনো ধরনের তিক্ত (উসকানিমূলক বা মানহানিকর) কিংবা লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া যাইবে না। কোনো প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করিবার উদ্দেশ্যে কোনো বলপ্রয়োগ বা অর্থ ব্যয় করিতে পারিবেন না। ইহার সহিত যাহা অত্যন্ত গুরুত্বপূূর্ণ, তাহা হইল প্রচার-প্রচারণায় নির্বাচনি ব্যয়। নির্বাচনি আচরণবিধিতে স্পষ্ট করিয়া বলা হইয়াছে, প্রার্থীকে আইনে নির্ধারিত ব্যয়সীমার মধ্যে থাকিয়া প্রচারে নির্বাচনি ব্যয় করিতে হইবে। এইবার ভোটারপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করিয়া দেওয়া হইয়াছে ১০ টাকা। তবে কোনো আসনে ভোটারের সংখ্যা যাহাই হউক না কেন, সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করিতে পারিবেন প্রত্যেক প্রার্থী। এই ব্যয় একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব হইতে বহন করিতে হইবে। সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে প্রতিদিনের ব্যয় ভাউচারসহ সংরক্ষণ করিয়া নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার নিকট জমা দেওয়ার বিধান রহিয়াছে।
একটি অবাধ, সুষ্ঠু, পক্ষপাতহীন নির্বাচনের জন্য প্রত্যেক প্রার্থী এই সকল বিধি যথাযথভাবে পালন করিতেছেন কি না, তাহা কঠোরভাবে নজরদারি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনে দাঁড়াইবার অধিকার যেহেতু প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিকের রহিয়াছে, সেই কারণে অনেক দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক, মাদকের কারবারিরাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন। এখন যাহাদের শত শত কোটি অবৈধ অর্থ রহিয়াছে, মাদক কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জন করা কালো টাকা রহিয়াছে, তাহারা চাহিলেই রাতের আঁধারে কালো টাকা দিয়া ভোটারদের ভাসাইয়া দিতে পারিবেন। কথায় বলে, টাকা দেখিলে নাকি কাঠের পুতুলও হা করিয়া থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ বোঝেন না তাহাদের ঐ একটি ভোটের কী বিশাল মূল্য। তাহারা ঐ একটি দিনই ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে পাঁচ বত্সরের জন্য তাহাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করিতেছেন। এই জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই তাহাদের ভবিষ্যত্ নির্ধারিত হইবে। সুতরাং তাহার একটি ভোটও অত্যন্ত মূল্যমান। কিন্তু অনেকেই এই মূল্যবান ভোটের গুরুত্ব অনুধাবন করিতে পারেন না। তাহারা অনেক ক্ষেত্রেই মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভোট বিক্রয় করিয়া দেন। সুতরাং ভোটারদের অবশ্যই সচেতন হইতে হইবে।
একই সঙ্গে নির্বাচনি মাঠে যেই আট শতাধিক নির্বাহী হাকিম দায়িত্ব পালন করিতেছেন এবং রহিয়াছে ৩০০ নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি, তাহাদের দায়িত্ব রহিয়াছে আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ হওয়া প্রার্থীরা যেন নির্বাচনি আচরণবিধি যথাযথভাবে পালন করেন। কারণ, ইহাদের অনেকেরই এত বেশি কালো বা অবৈধ অর্থ রহিয়াছে যে, তাহাদের সুযোগ দিলে অর্থ দিয়া তাহারা ভোটারদের ভাসাইয়া দিতে পারিবেন। সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করিবার যেই ঊর্ধ্বসীমা, এই পরিমাণ অর্থ ইহাদের নিকট নস্যি মাত্র। যেই সকল প্রার্থী কালো টাকার মালিক, তাহাদের ব্যাপারে বিশেষ নজরদারি করা না হইলে আসন্ন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নির্ঝঞ্ঝাট হইবে না।
