আমাদের ভুল করিবার সুযোগ নাই

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:০০

এই বছর স্বাধীনতার ৫২ বছর পূর্তি হইয়াছে, আর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ৭১ বছর পূর্ণ করিয়াছে। ইত্তেফাকও আজ একাত্তরে পা রাখিল। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ এই কাকতাল। ‘ইত্তেফাক’ শব্দটিরও একটি সমার্থক অর্থ হইল ‘কাকতালীয়’। ইহার অনেকগুলি সমার্থক অর্থ রহিয়াছে—মতৈক্য, ঐকমত্য, সমঝোতা, সম্প্রীতি, সামঞ্জস্য, সংগতি ইত্যাদি। ব্যুত্পত্তিগত অর্থ বিশ্লেষণ করিলে ইত্তেফাকের অর্থ হইল—বিচ্ছিন্ন কতগুলি বিষয়কে একত্রিত করা, মিলিত করা। এই হিসাবে সাধারণভাবে দৈনিক ইত্তেফাক শব্দের মর্মার্থ এইভাবে করা যাইতে পারে—দেশ-বিদেশের তথ্য-উপাত্ত, ঘটনাপ্রবাহ হইতে সত্যনিষ্ঠ সংবাদটি সিঞ্চন করিয়া পাঠককুলের সামনে উপস্থাপন করা। প্রথমে ১৯৪৯ সালে সাপ্তাহিক এবং পরে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর যখন দৈনিক পত্রিকা হিসাবে ইত্তেফাক আত্মপ্রকাশ করে, তখন এই জনপদের গণমানুষের মুখপত্র হইয়া উঠিবার জন্য ‘ইত্তেফাক’ নামটি গ্রহণ করিবার ক্ষেত্রে পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠার সহিত জড়িত সকলের নিশ্চয়ই বিশেষ চিন্তাভাবনা ছিল। যাহাদের হাত ধরিয়া দৈনিক ইত্তেফাক আজ একাত্তরটি বছর স্পর্শ করিল, তাহাদের আজ আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করিতেছি। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সীমাহীন অবদান রহিয়াছে ইত্তেফাককে একটি জাতির মুখপত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করায়।

বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রতিটি স্তরে রহিয়াছে ইত্তেফাকের অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভূমিকা। স্বাধীনতা-পূর্ব সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংবাদিকতা কখনো এক হইতে পারে না। স্বাধীনতা-পরবর্তী সাংবাদিকতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হইল উন্নয়নমূলক ও নৈর্ব্যক্তিক সাংবাদিকতা। সেই ক্ষেত্রেও বিগত পাঁচ দশক ধরিয়া ইত্তেফাক বহু ক্ষেত্রেই পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করিয়াছে বলিয়া বিদ্বজ্জনেরা বলিয়া থাকেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’ বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান ৭১ বছর ধরিয়া টিকিয়া রহিয়াছে—ইহাও কম বিস্ময়ের নহে। অনেক ঝড়ঝাপটা আসিয়াছে; কিন্তু আইসবল এফেক্টের মতো ইত্তেফাকের শরীরে জমিয়াছে অভিজ্ঞতার অমূল্য অলংকার। হয়তো সাংবাদিকতার স্বাধীনতা উন্নয়নশীল বিশ্বেই আজ ক্রমশ সোনার পাথরবাটি হইয়া যাইতেছে; কিন্তু যেই আদর্শ লইয়া ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, সেই আদর্শ হইতে ইত্তেফাক কখনো বিচ্যুত হয় নাই। সেই আদর্শ ও উদ্দেশ্য হইল—অন্য কোনো ‘পত্র’ নহে, কেবল ‘সংবাদপত্র’ হিসাবে গণমানুষের সংবাদ প্রকাশের ও অধিকারের দর্পণ হওয়া। চারিদিকে তাকাইলে আমরা এখন অনেক বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখিতে পাই। ফোর-জি হইতে ফাইভ-জি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তাল ঢেউয়ে সমগ্র পৃথিবীর ছাপা সংবাদপত্রই আজ সংগ্রাম করিতেছে টিকিয়া থাকিবার। একাত্তর বছর পূর্বে যেই মশাল আমাদের হাতে উঠিয়াছে, সেই আলো হয়তো নিষ্প্রভ হইতে পারে, টিমটিম করিয়া জ্বলিতে পারে; কিন্তু তাহা নিভিবে না। যত দিন আমরা পারিব এই মশাল হাতে এই জনপদকে সত্য দর্পণে আলোর জোগান দিতে থাকিব। ভুলিয়া গেলে চলিবে না—আমরা কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় আছি। মনে রাখিতে হইবে—একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আধাসামন্তবাদী সমাজ হইতে আমাদের উত্তরণ ঘটিয়াছে। কোনো অন্ধকারই রাতারাতি দূর হয় না। ইহাও দূর হইতে সময় লইবে। এককালের অন্ধকারই যেমন শেষ কথা ছিল না, তেমনটি এই আধা-অন্ধকার দিনগুলিও শেষ কথা নহে।

এই বিশ্ব এখন একধরনের ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়া যাইতেছে। আমরা এমন একটি জায়গায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছি, যেইখানে ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে বিবিধ পথের ছড়াছড়ি। কোন পথে কোনদিকে আমরা অগ্রসর হইব, তাহা আমাদের ভবিষ্যত্ নির্ধারণ করিয়া দিবে। সঠিক পথে অগ্রসর হইলে ভালো; কিন্তু ভুল পথে পা বাড়াইলে আগামী বহু বছর ধরিয়া তাহার খেসারত এই জাতিকে দিতে হইবে। সুতরাং এই যুগসন্ধিক্ষণে আমাদের ভুল করিবার কোনো সুযোগ নাই।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন