পৃথিবীতে যুগে যুগে মানুষকে পথ দেখাইবার জন্য ত্রাতাগণ আসিয়াছেন। এই সকল ত্রাতাকে অনেক ক্ষেত্রেই ভোগ করিতে হইয়াছে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা আর কষ্ট। তাহার পরও আমরা দেখিতে পাই, ত্রাতাদের নিকট মানুষের প্রতি ভালোবাসার ফল্গুধারা কখনো কমে নাই। এমনি এক ত্রাতার আবির্ভাব হইয়াছিল আজি হইতে দুই সহস্রাধিক বত্সর পূর্বে। তিনি মহামতি যিশু খ্রিষ্ট। খ্রিষ্টধর্ম মতে, যিশু খ্রিষ্ট এই পুণ্যময় দিনে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে বেথলেহেমে জন্মগ্রহণ করেন। তাহার অনুসারীরা মনে করেন যে, দুই সহস্রাধিক বত্সর পূর্বে এই পৃথিবী যখন তমসাচ্ছন্ন ছিল, মহামতি যিশু আলোর দিশারি হইয়া পথ দেখাইয়াছেন মানবজাতিকে। অত্যন্ত দীনবেশে, একটি গোশালায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আজীবন দীনবেশেই জীবনাচরণ করিয়া তিনি দরিদ্রকেই ধন্য করিয়াছেন। কাজী নজরুল ইসলামের কলমে আমরা মহান যিশুর সেই দারিদ্র্যের গুণগান শুনিতে পাইয়াছি—‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান। তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান।’
খ্রিষ্টধর্মের এক অপার সৌন্দর্য হইল ‘ভালোবাসা’। ‘ঈশ্বর’ ও ‘ভালোবাসা’ মহান যিশুর কর্মকাণ্ডের জন্য পরিপূরক হইয়া উঠিয়াছে। বিশ্বের কোটি কোটি খ্রিষ্টান ধর্মানুসারীর নিকট যিশু হইলেন ঈশ্বরপুত্র। মাত্র ৩৩ বত্সর বয়সে তিনি ক্রুশবিদ্ধ হন; কিন্তু ক্রুশে বিদ্ধ অবস্থাতেও তিনি ছিলেন ক্ষমাশীলতায় উদ্ভাসিত। ইহাও অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ যে, যেই সাতটি বাণী ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় মহতী যিশু উচ্চারণ করিয়াছেন, তাহার প্রথম কথাটিই হইল—ক্ষমা। জীবনাচরণে তিনি প্রেম, সেবা ও সৌহার্দের প্রতীক হইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছেন—‘পিতঃ, ইহাদিগকে (যাহারা তাহাকে ক্রুশবিদ্ধ করিয়াছে) ক্ষমা করো; কেননা ইহারা কী করিতেছে তাহা জানে না।’ তিনি যেই আদর্শ ধারণ করিয়াছিলেন—দুই সহস্র বত্সর পর আজও তাহা কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করিয়া যাইতেছে—ইহা সবিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। যে কোনো আদর্শ ধর্মের সারসত্য হইল—মানবকল্যাণ ও সম্প্রীতি। খ্রিষ্টধর্মেও তাহার প্রতিচ্ছাপ দেখিতে পাওয়া যায়। দুই সহস্র বত্সর পূর্বের যে বাণী লইয়া মহান যিশু আত্মাহুতি দিয়াছিলেন তাহার মাহাত্ম্য আজও সমানভাবে বিরাজিত। যিশুর ধর্ম-কর্ম-জীবন যুগ যুগ ধরিয়া পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষকে অন্ধকার হইতে আলোরপথে লইয়াছে, অসত্য হইতে সত্য পথের দিশা দিয়াছে—যাহা আজও প্রবহমান। বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে সোয়া দুই শতাধিক কোটি মানুষ খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী। বাংলাদেশে রহিয়াছে সকল ধর্মের-সম্প্রদায়ের মানুষের অপূর্ব সহাবস্থান। যদিও প্রায় ১৬ কোটির এই দেশে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা খুব বেশি নহে—৫ লক্ষের কাছাকাছি। তবে এই উপমহাদেশে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ইতিহাস ৪০০ বত্সরের অধিক।
বড়দিনের মাহাত্ম্য বিশ্বের শান্তির জন্য, মঙ্গলের জন্য। বিশ্ব আজ অনেক বেশি সংঘাতময়। সেই কোনকালে কবি বড়ু চণ্ডীদাস বলিয়া গিয়াছেন—‘সবার উপরে মানুষ সত্য’—কিন্তু আধুনিক বিশ্ব যেন তাহা ভুলিতে বসিয়াছে। হানাহানি আর মতলববাজিতে ভরিয়া গিয়াছে সমগ্র বিশ্ব। খ্রিষ্টের ক্ষমা ও মানবপ্রেমের দৃষ্টান্ত বিশ্বের কাছে তুলিয়া ধরিবার শ্রেষ্ঠ সময় এখন। ভাঙিয়া যাক যত অমানবতার দেওয়াল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়—‘ভাঙো বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও।/ বন্দি প্রাণ মন হোক উধাও।’
খ্রিষ্টের শুভ জন্মতিথিতে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এই মহতী পরমাত্মাকে। খ্রিষ্টধর্মের কোটি কোটি অনুসারীকে জানাই প্রীতি, শুভেচ্ছা ও সম্ভাষণ।
