এ বছর তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে ৭.৮, মরক্কো ৬.৮, আফগানিস্তানে তিনটি ৬.৩, নেপালে ৫.৭ ও সবশেষ চীনে ৫.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাণহানি ঘটেছে প্রথমটিতে ৫৯,২৫৯, পরের দুইটিতে ২ হাজারের বেশি করে, নেপালে ১৫৩ ও চীনে ১৩১ জনের এবং প্রথমটির ক্ষতির পরিমাণ ১১৮.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশ ও আশপাশে হালকা-মাঝারি (৪.০-৫.৯) মাত্রার অনেকগুলো ভূমিকম্প হয়েছে, সবশেষটি ছিল ২ ডিসেম্বরের ৫.৬ মাত্রার ঢাকার কাছে রামগঞ্জে। এ ভূমিকম্পগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি না হলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পরে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ অনেক আলোচনা করেছেন, মতামতও রেখেছেন। কারো মতে রামগঞ্জেরটি ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন বলয়ে, আবার অন্যমতে ক্রাস্টাল চ্যুতিতে সৃষ্ট ভূমিকম্প। ভূমিকম্পের পৌনঃপুনিকতা আসন্ন উচ্চমাত্রার কোনো ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ, নাকি ভবিষ্যতের শক্তিশালী ভূমিকম্পের শক্তি ক্ষয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাসের ইঙ্গিত, তা আলোচনাগুলোতে এসেছে—তবে দুটি সম্ভাবনাই রয়ে যায়। বাংলাদেশ ও আশপাশে ৭-৮ মাত্রার কাছাড় ১৮৬৯, বেঙ্গল ১৮৮৫, গ্রেট ইন্ডিয়ান ১৮৯৭, শ্রীমঙ্গল ১৯১৮, ধুবড়ী ১৯৩০, নেপাল-বিহার ১৯৩৪, আসাম ১৯৫০ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। তবে সিকিম ২০১১ (৬.৯) ও গোরখা ২০১৫ (৭.৮) ভূমিকম্প আমরা অনুভব করেছি—দেশে কিছু ক্ষতি হয়েছে, পরেরটিতে ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আতঙ্কে আহত হয়ে মানুষ হাসপাতালেও গেছে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্ব দিকে যথাক্রমে ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান পাতসমূহের সংঘর্ষ এবং ইন্ডিয়ান পাত বার্মিজ পাতের নিচে অবনমনের ফলে ভূমিকম্পগুলোর সৃষ্টি হয় এবং ভবিষ্যতে সম্ভাবনা রয়ে যায়। ভূমিকম্প বিষয়ে দেশ-বিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্থা গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) ও মাঠপর্যায়ে নানা পদ্ধতিতে গবেষণা এবং ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে গবেষণা হয়েছে। জানা গেছে যে, ডাউকি চ্যুতিতে ১৮৯৭, মধুপুর চ্যুতিতে ১৮৮৫ ও প্লেটবাউন্ডারি চ্যুতির, যাকে আরাকান মেগাথ্রাস্টও বলা হয়, ত্রিপুরা অংশে ১১০০ ও দক্ষিণাংশে ১৭৬২ সালে ভূমিকম্প হয়েছিল। ভূতত্ত্ববিদগণ ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্ত সময়সীমা ডাউকি চ্যুতিতে ৩৫০-৬৫০ বছর, মধুপুর চ্যুতিতে ২০০০ বছর এবং মেগাথ্রাস্টের ত্রিপুরা অংশে ২ হাজার (?) ও পরের অংশে ৩০০, ৪৫০, ৯০০ বছর নিরূপণ করেছেন। তারা দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরো ১৩টি চ্যুতি চিহ্নিত করেছেন।
অতিতের ভূমিকম্পগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়নি, কারণ তখন জনসংখ্যা ও জন ঘনত্ব কম থাকায় প্রাণহানি কম হয়েছে এবং বড় স্থাপনা কম ছিল। তবে তখনকার বাঁশ-খড়-কাঠ-টিনের অবকাঠামোতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পে তেমন প্রভাব না পড়লেও ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল, বিশেষত ১৮৯৭ ভূমিকম্পের প্রতিবেদনে এগুলোর বিবরণ আছে। কিন্তু এখন এমনটি ঘটলে অবকাঠামোসহ মানুষের জীবন-জীবিকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। একটা উদাহরণ দিলে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বুঝতে সুবিধা হবে। তিস্তা নদী যদি এমন কোনো এক ভূমিকম্পে পশ্চিম দিকের অতিতের প্রবাহসমূহের কোনোটিতে ফিরে যায় তাহলে কী হবে—ফসলের মাঠ, সমতল ভূমি, জলাভূমিতে পরিবর্তন আসবে, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি ঘটবে। মানুষ ভূমিকম্প ঠেকাতে পারে না, এমনকি এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও ভূমিকম্পের আগাম বার্তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অতি সম্প্রতি আমেরিকার সেইসমোলজিক্যাল সোসাইটির বুলেটিনে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে জানা গেছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে চীনা গবেষকগণ ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ আগে আগাম বার্তা দিতে ৭০ শতাংশ সফল হয়েছেন। কিন্তু এজন্য বিপুল পরিমাণের উপাত্ত ও বহু বছরের ভূমিকম্পের উপাত্ত দরকার হলেও গবেষকগণ ভূমিকম্পের আগামবার্তা প্রদানের ক্ষেত্রে এটিকে মাইলফলক ও উত্সাহব্যাঞ্জক হিসাবে দেখছেন।
আমাদের দেশে ভূমিকম্প গবেষণায় অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে—কিছু ভূপ্রাকৃতিক ও কিছু নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যজনিত। ভূতাত্ত্বিক ও টেকটোনিক অবস্থান ও এসবের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এ অঞ্চলে ভূমিকম্প সংঘটন প্রক্রিয়া ভিন্নতর। দেশের উত্তরে ইন্ডিয়ান-ইউরেশিয়ান প্লেট, পূর্বে ইন্ডিয়ান-বার্মা প্লেট এবং উত্তর-পূর্বে হিমালয়ান আর্ক (চাপ), শিলং প্ল্যাটু, পূর্ব হিমালয়ান সিনট্যাক্সিস ও ইন্দো-বার্মিজ ওয়েজ নামের টেকটোনিক উপাদানগুলোর মিথষ্ক্রিয়ায় এ অঞ্চলে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তদুপরি দেশের ভেতরে রয়েছে আলাদা আলাদা ভৌত ও ভূপ্রকৌশল গুণাগুণসমৃদ্ধ ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ভূপ্রকৃতি-ভূতত্ত্ব, যা জটিল। দেশের বেশির ভাগ এলাকা কোয়াটারনারি যুগের অর্থাত্ কয়েক লাখ হতে প্রায় ১১ হাজার বছর বয়সি নদীজ-বদ্বীপীয় পললের পুরু আবরণে ঢাকা থাকায় চ্যুতিগুলো ভূপৃষ্ঠতলে দৃশ্যমান নয়। এছাড়া সক্রিয় চ্যুতি অনেকক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে, এগুলোতে ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশেরও তার প্রভাব পড়বে। দেশের উত্তর দিকের সীমার বাইরে ২০২১ সালে ও এ বছরও ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া আবহাওয়া ও উচ্চ জনঘনত্বের প্রভাব ভূরূপে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আনছে। আগামীর উঞ্চ জলবায়ু বড় মাত্রার ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্ত পৌনঃপুনিকতা বৃদ্ধি করবে বলে গবেষকগণ মনে করছেন। তদুপরি এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ইতিহাস বিষয়ে পুরোনো তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষিত হয়নি, যেখানে গ্রিস বা চীনের দীর্ঘ দিনের ইতিহাস রয়েছে। ভূমিকম্পের পরিমাণগত তথ্য যেমন মাত্রা, উপকেন্দ্র, চ্যুতির দৈর্ঘ্য, হাইপোসেন্টারের গভীরতা, পূর্ববর্তী ঘাত ও পরাঘাতের (ফোর ও আফটার শক) সংখ্যা বা হতাহতের সংখ্যা ইত্যাদি উপাত্ত সম্বন্ধে আমাদের জানার পরিধি অত্যন্ত সীমিত। সম্ভবত ১৫৪৮ সালের আগে সংঘটিত ভূমিকম্পের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। নানা উত্স থেকে প্রাপ্ত ১৭৬২ সালের এপ্রিলের ভূমিকম্পের তথ্যই হয়তো প্রথম একটু বিশদ পাওয়া এবং আরো অতীতে পিছিয়ে গেলে কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের একটু নিচের পললস্তরে অতীতের ভূমিকম্পের প্রমাণ পাওয়া যায়, এমনকি প্রত্নতাাত্ত্বিক স্থাপনাতেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। ছোট-বড় ভূমিকম্পসমূহের বিশ্লেষণ, ডেটা মডেলিং ও ভূত্বকের গতিশীল প্রক্রিয়াগুলোর ব্যাপারে আমাদের বোঝাপড়াকে উন্নত করতে এবং বিভিন্ন সময়ে চ্যুতিসমূহের পীড়ন-বিকৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহ জানা দরকার। চ্যুতির যে অংশ অতিতে ভূমিকম্পের উত্স হিসাবে কাজ করেছে কিন্তু বর্তমানে শান্ত আছে, যাকে সেইসমিক গ্যাপ বলে—দেশের উত্তরের হিমালয়সম্মুখ (প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশে কয়েক শ বছর ভূমিকম্প হয়নি) এবং পূর্বের অবনমন অঞ্চলে এমন গ্যাপের অস্তিত্বের কথা গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন। সম্ভাব্য ভূমিকম্পের মাত্রাসহ আরো কিছু অজানা বা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। কাজেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো জানতে এবং ঝুঁকি হ্রাসে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদে ভূমিকম্প সংক্রান্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত গবেষণা। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে, ভবিষ্যত্ গবেষণা ও মূল্যায়নের জন্য বত©মান ভূমিকম্পগুলোর তথ্য-উপাত্তসহ প্রভাবের লেখ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ করাও তাত্পয©পূণ©।
প্রায়শই ভূমিকম্প সংঘটন ও আগামী দিনের সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাসে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রস্তুতি গ্রহণের ব্যাপারে বিশেজ্ঞগণ বহুদিন থেকেই বলে আসছেন। দেশের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণকে নিরাপদ করতেও বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেওয়া দরকার। ভূমিকম্পের লভ্য উপাত্তের ভিত্তিতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রণীত ভূমিকম্প প্রতিরোধী অবকাঠামোর নকশা তৈরির নিয়মাবলি-সংবলিত একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ১৯৭৯ সালে প্রকাশ করে। এ দেশে চট্টগ্রামের আমবাগানে ১৯৫৪ সালে প্রথম সেইসমিক স্টেশন স্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়ে সিটিবিটিওর আওতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন চট্টগ্রামে সেইসমিক স্টেশন স্থাপন করে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ১৩টি, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা আরো সেইসমিক স্টেশন স্থাপন করেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব সামর্থ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত যন্ত্রসমূহের মাধ্যমে ভূমিকম্পের উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছে কিন্তু গবেষণা কাজে তাদের সমন্বয় দৃশ্যমান নয়। আবার বাস্তবতা হলো কোনো প্রতিষ্ঠানই প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকবলে এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। গবেষণাকাজে মূলত ভূতত্ত্ববিদ ও ভূকম্পনবিদ, ভূপদার্থবিদ, প্রত্নভূকম্পনবিদ, জিওডেটিস্টগণের এবং ঝুঁকি হ্রাসকল্পে গবেষণালব্ধ ফলাফল প্রয়োগের জন্য প্রকৌশলী, স্থপতি, ভূপ্রকৌশলী, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, প্রশাসন, উদ্ধারকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীসহ সবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা কর্মসূচি যেমন সাধারণ জনগণ বিশেষত স্কুল শিক্ষার্থীদের জানানো, ভূমিকম্প ড্রিল ইত্যাদিতে জোর দেওয়া এবং বিল্ডিং কোডের কঠোর অনুসরণ তথা সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ অতীব জরুরি।
লেখক: ভূতত্ত্ববিদ ও গবেষক
