প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা প্রয়োজন

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৩০

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের (বিআইডিএস) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশের ৯৫ শতাংশ প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি সংবাদেও বলা হইয়াছে, ১২০৯ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়াছে তিন বত্সরে। নির্ধারিত সময়ে শেষ করিতে না পারায় এইসকল প্রকল্প বাস্তবায়নে গড়ে ব্যয় বাড়িয়া থাকে প্রায় ২৬ শতাংশ। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ৮০ শতাংশ প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর কারণে অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া ও খরচ বৃদ্ধির নেপথ্যে সবচাইতে বড় কারণ হিসাবে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং কাজের পরিধি পরিবর্তনের বিষয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে। সেইখানে বলা হইয়আছে, জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কাজের পরিধি পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে ৪৯ শতাংশ।

ইহা সত্য যে, বহু প্রকল্পেরই মেয়াদ ও বাজেট বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ থাকে। আর প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল নহে। যথাসময়ে কাজ শেষ করিতে না পারিবার বহু নজির বহু দেশে রহিয়াছে। আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই টাকা সাশ্রয়সহ প্রকল্পের কাজ শেষ করিবার নজির বাংলাদেশেও রহিয়াছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার পাল্লা অনেক বেশি ভারী। কিছু প্রকল্পে সময় বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ থাকে। অনেক দেশীয় প্রকল্প চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পায় না। তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ও প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতার কারণে বাস্তবায়নে দেরি হয়। বেশির ভাগ প্রকল্প পরিচালকেরই প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা কম। প্রকল্প পরিচালক বারংবার বদলও ইহার জন্য দায়ী। তাহার পরও জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা না থাকিলে, বরাদ্দ ঠিকমতো দেওয়া হইলে এবং ঘনঘন সরকার বা মন্ত্রীর পালাবদল না ঘটিলে সময় বৃদ্ধি ব্যতিরেকেই নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অনেক প্রকল্প দেখা যাইতেছে যথাযথ ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়াই নেওয়া হইয়াছে। অর্থাত্ পুরাটাই অনুমাননির্ভর। এই কারণে প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয় না। ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এই জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশনা দিয়াছেন, প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ থাকিলে সেইগুলিতে কতটা জটিলতা রহিয়াছে—তাহা চিহ্নিত করিয়া প্রকল্প লইতে হইবে।

প্রকল্প পরিচালকদের কখন কোন কাজ করিতে হইবে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবেই (ডিপিপি) সেই পরিকল্পনা দেওয়া থাকে। সুতরাং প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার কোনো কারণ থাকা উচিত নহে। অনেকেই মনে করেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করিবার ক্ষেত্রে আমরা অভ্যস্ত হইয়া উঠি নাই। অর্থাত্ আমাদের মানসিকতার মধ্যে রহিয়াছে দীর্ঘসূত্রতার অপসংস্কৃতি। এই মানসিক বন্ধ্যাত্ব হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। একই সঙ্গে যাহারা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, সেই প্রকল্প পরিচালকদের প্রশিক্ষণের অভাব যাহাতে না থাকে, প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে তাহা বিবেচনায় রাখিতে হইবে। বহুক্ষেত্রেই প্রকল্পে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কারিগরি জ্ঞান সীমিত থাকে। সুতরাং কেন প্রকল্পের মেয়াদ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বৃদ্ধি করিতে হইতেছে; কেন মনে করা হয়, সময়ের কাজ সময়ে শেষ না-হওয়াটাই স্বাভাবিক— এই অপসংস্কৃতি হইতে বাহির হইবে। ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি লইয়া ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি প্রায়শই যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়া থাকেন। কিন্তু তাহার পরও অনেক ক্ষেত্রে বিবিধ সব কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির লাগাম টানিয়া ধরা সম্ভব হইতেছে না।

প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যদি কাহারো গাফিলতি কিংবা অন্য উদ্দেশ্য থাকে, তবে অবশ্যই সেইখানে সরকারকে ব্যবস্থা লইতে হইবে। কোনো প্রকল্পের মেয়াদ বা ব্যয় বাড়ানোর আগে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি আদায় করা দরকার। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করিতে না পারিলে ইহার জন্য জবাবদিহিতার ও অনিয়ম খুঁজিয়া পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়াটাও জরুরি।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন