মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের ভালোমন্দ

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৪০

মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট হলো, একটি ব্যবস্থাপনাশৈলী বা কৌশল বা উপায়, যেখানে এক জন ব্যবস্থাপক অধস্তন বা কর্মচারীদের কাজ বেশি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণ করে। ছোট পরিসরে এর কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সামগ্রিকভাবে মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের সাধারণত একটি নেতিবাচক দিক থাকে। আমাদের সবার কাছে এটি হচ্ছে—অধীনস্থ কর্মীদের প্রতি অতিরিক্ত খবরদারি। এই ধরনের ব্যবস্থাপনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কর্মপ্রবাহকে বিঘ্নিত করে।

তাহলে মানুষ মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট কেন করে? মাইক্রো ম্যানেজিং হলো, ব্যবস্থাপনার একটি উপায় যাতে নিশ্চিত করা যায়, যে কাজগুলি সুনির্দিষ্টভাবে সম্পাদিত হয়। সমস্যা হলো, এটা সবসময় সঠিক বা সবচেয়ে উত্পাদনশীল বা সর্বোত্তম উপায় নয় এবং ব্যবস্থাপনার অন্যতম সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট। এই ব্যবস্থাপনাশৈলীর কিছু সমস্যার দিকে নজর দেওয়া যাক।

নিয়ন্ত্রণ হারানো : যখন কর্মীদের মাইক্রো ম্যানেজ করা হয়, তখন সিনিয়রের হাতে যেসব ম্যানেজমেন্ট টুলস আছে, তার দ্বারা নিজেকে পরিচালিত করে, যতক্ষণ না তার নাগালে সবকিছু চলে আসে। এটিই পরিচালনার ক্ষেত্রে সিনিয়রের একমাত্র টুলস বা উপায়। টিমকে মাইক্রো ম্যানেজ করার চেষ্টা করার কারণে, ব্যবসার প্রবৃদ্ধির জন্য সময় ব্যয় করার পরিবর্তে মাইক্রো ম্যানেজের কাজে সময় বেশি ব্যয় হয়। এটা উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ যে, অনেকগুলি ভালো ব্যবস্থাপনাশৈলী রয়েছে, যেগুলো অনুসরণ করলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অনেক বেশি কাজে উত্সাহিত হবে এবং ব্যবসার প্রসার লাভ ঘটবে।

বিশ্বাস হারানো : মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট শেষ পর্যন্ত সিনিয়র ও জুনিয়র কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি করে। কর্মীরা তখন তার সিনিয়রকে একজন ম্যানেজার হিসেবে না  দেখে একজন স্বৈরশাসক হিসেবে দেখে। সিনিয়রের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে প্রাচীর হিসেবে দাঁড়ায় মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট।  বিশ্বাস চলে গেলে দুটি জিনিস ঘটতে পারে : উত্পাদনশীলতার মারাত্মক ক্ষতি এবং কর্মীদের কাজ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিরক্তি বা অনীহা।

নির্ভরশীল কর্মচারী : মাইক্রো ম্যানেজ হওয়ার পর, কর্মীরা নিজেরাই কাজ সম্পাদন করার আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তে সিনিয়রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করতে শুরু করে। মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের ফলে কর্মীরা সবসময় এটা মনে করবে যে, তাদের প্রতিটি কাজে অবশ্যই সিনিয়রের নির্দেশনা থাকবে। নির্ভরশীল কর্মীরা পরিচালনা করতে বেশি সময় ও প্রচেষ্টা নেয়, যা কাজের সময়সূিচ এবং শারীরিক ও মানসিক এনার্জির ওপর প্রভাব ফেলে। যখন কর্মচারীরা সিনিয়রের ওপর কম নির্ভরশীল হয় বা স্বাধীনভাবে কাজ করতে থাকে, তখন তারা নিজেরাই চিন্তা করতে থাকবে এবং যখন কর্মচারীদের নিজেদের চিন্তা করার স্বাধীনতা থাকে, তখন দারুণ ইতিবাচক কিছু ঘটতে পারে।

সিনিয়র যদি খুব বেশি মাইক্রো ম্যানেজ করে, তাহলে কর্মীদের দক্ষতা, প্রতিভা ও দূরদৃষ্টিগুলি কমে যেতে পারে। অনেকটা ‘জো-হুকুম জাহাপনা’ টাইপের। সিনিয়রকে অবশ্যই কর্মীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ও কাজ করার অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন।

ম্যানেজার বার্নআউট : মাইক্রো ম্যানেজিং একেবারে ক্লান্তিকর একটি পন্থা। প্রতিদিন এত কর্মীর দিকে তাকানো খুব দ্রুত সিনিয়রকে অতিরিক্ত কাজের চাপে ফেলবে। অবশেষে অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে চাকরির প্রতি একসময় অনীহা আসতে শুরু করবে। যদি কাজের প্রতি যথেষ্ট অনীহা চলে আসে, তবে সিনিয়র নিজেও কাজ বা চাকরি ছেড়ে যেতে পারে।

অবশ্যই বার্নআউট যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে সর্বদা একটি বিপদ। তবে মাইক্রো ম্যানেজিংয়ের সময় যে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের শক্তি ক্ষয় হয়, তা অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি। বার্নআউটের এই অনুভূতি শুধু কর্মজীবনকে প্রভাবিত করে না, পারিবারিক জীবনেও প্রসারিত হতে পারে এবং এমনকি উদ্বেগ ও হতাশার কারণও হতে পারে। শুধু ম্যানেজাররাই যে বার্নআউট হয় তা নয়, তাদের নিচের লোকদের মধ্যেও তা সংক্রামিত করতে পারে।

কর্মীদের উচ্চ টার্নওভার : সহজ কথায়—বেশির ভাগ মানুষ মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতিকে ভালোভাবে নেয় না। যখন কর্মীদের মাইক্রো ম্যানেজ করা হয়, তখন তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে একটি কাজই করে, তা হলো, নতুন চাকরি খুঁজে চলে যায়। ম্যানেজাররা মাইক্রো ম্যানেজ করে যেসব কারণে সেগুলো হচ্ছে—ইগো, নিরাপত্তাহীনতা, অনভিজ্ঞতা, নিখুঁততাবাদ, অহংকার ইত্যাদি। যার ফলে ঘটে কর্মীদের উচ্চ টার্নওভার। ক্রমাগত কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং পুনরায় প্রশিক্ষিত করার ফলে শুধু কাজের গতিই মন্থর ও ছন্দহীন হয় না, এটি প্রতিষ্ঠানকে কম যোগ্য লোকদের জন্য একটি অভয়ারণ্য হিসেবে তৈরি করে। মাইক্রো ম্যানেজমেন্টের কারণে অনেক বেশি হারে ভালো কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে।

এম্পাওয়ারমেন্টের অভাব : যখন কোনো ম্যানেজার মাইক্রো ম্যানেজ করেন, তখন কর্মীরা মনে করতে শুরু করে যে, তারা তাদের এম্পাওয়ারমেন্ট হারাচ্ছে। যখন এটি ঘটবে, তখন তারা ধীরে ধীরে ম্যানেজার যা চান তা ছাড়া আর কিছু করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলবে। কেউ ছক বা বক্সের বাইরে পা রাখবে না অথবা একটি কাজের জন্য নিজে থেকে একটু বেশি করে কাজ বা চিন্তা বা মেধা খরচ করতে চায় না। সেই একই লোকদের যদি একটি নির্দিষ্ট লেভেলে এম্পাওয়ারমেন্ট দেওয়া হয় এবং তারা তখন প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন অনেক কিছু করবে, যা দেখে ম্যানেজার নিজেও সেসব কর্মীর জন্য গর্বিত হবেন।

উদ্ভাবনের অভাব : মাইক্রো ম্যানেজিংয়ের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, কর্মীদের সৃজনশীল চেতনাকে বাধাগ্রস্ত করা। টিম মেম্বাররা যখন কোনো কাজ বা প্রজেক্টে কাজ করে, তারা তাদের অ্যানালাইসিস বা অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পারে, সেখানে কী ঘটছে বা ঘটবে। এমনও হতে পারে, তা অন্য কারো চেয়েও ভালো। তখন তারা যদি কিছু উদ্ভাবন সামনে নিয়ে আসে, তা হয়তো সবসময় সফল না-ও হতে পারে, তা-ও তাদের কাজের প্রতি সাপোর্ট দেওয়া বা ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করা দরকার, যা তাদের পরবর্তী কাজকে অনেক অনুপ্রাণিত করবে। যদি তা না করে তাদের কোনো একটি ব্যর্থতাকে নেগেটিভ ভাবে দেখে এবং অবজ্ঞা করে, তার ফলে তাদের উদ্ভাবনী ও সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত বা চূর্ণ করা হয়। তখন ভালো ধারণাগুলি বেরিয়ে আসার এবং কাজ ভাগ করে নেওয়ার সমস্ত সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়।

যদি কোনো ম্যানেজার নিজেকে মাইক্রো ম্যানেজিং ম্যানেজার হিসেবে খুঁজে পায়, তাহলে নিজেকে সংশোধন বা ঠিক করে নেওয়া উত্তম। যাদের সঙ্গে কাজ করতে হয়, তাদের প্রতি সিনিয়রের আস্থা ও বিশ্বাস থাকতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে, কর্মীরা ক্রমাগত তদারকি ছাড়াই কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন।

লেখক : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন