সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পলিনেট হাউজ: কৃষিতে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৫:০১

পলিনেট হাউজ উন্নতমানের পলি ওয়েলপেপারে আবৃত চাষযোগ্য কৃষি ঘর। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে নিরাপদ ফসল উত্পাদনের আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি প্রয়োগে আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে বছরব্যাপী উচ্চমূল্যের ফসল ফলানো যায়। এ প্রযুক্তিতে উত্পাদিত ফসল  প্রাকৃতিক দুর্যোগেও নিরাপদ ও অক্ষত রাখা যায়। পলিনেট হাউজে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সুবিধা থাকায় ফল-ফসল ও সবজি চারা আগাম উত্পাদন করা সম্ভব।

সময় যত গড়াচ্ছে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ততই বাড়ছে। এ অবস্থায় ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি। তাই নতুন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়েই। পলিনেট হাউস তেমনই এক গবেষণার ফসল। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি নিয়ন্ত্রণ, অত্যাধুনিক সেচ ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর পোকার প্রবেশ রুখে দিয়ে নিরাপদ ফসল উত্পাদনে এক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি।

পলিনেট হাউস তৈরি করা হয় নেট, পলি এবং লোহা বা বাঁশের অবকাঠামো দিয়ে। চারপাশে নেট দিয়ে ঘেরা হয়। আর ওপরের অংশে থাকে পলিথিন বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ত্রিপল। পলিনেট হাউস তৈরি করতে প্রয়োজন  তাপমাত্রা সহনশীল বিশেষ পলিথিন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী মেশিন। এর সঙ্গে জৈব সার আর নারিকেলের ছোবড়া পচিয়ে বিশেষ উপাদান তৈরি করতে হয়। ভেতরে যেসব সবজির আবাদ করা হবে, সেগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আর এর ভেতরের অংশে চাষাবাদের জন্য পলিমাটি, ভরাট বালি, ছাই, গোবর সার, খৈলসহ নানা উপকরণ মিশ্রণে প্রস্তুত করা হয় চাষের জমি। সেখানে পলিথিনের আচ্ছাদন ব্যবহার করায় সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ভেতরে প্রবেশে বাধা পায় এবং অতিবৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ফসল অক্ষত থাকে।

পলিনেট হাউসে উচ্চমূল্যের ফসল যেমন ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, রকমেলন, রঙিন তরমুজ, রঙিন ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুস ও অসময়ের সবজির পাশাপাশি চারা উত্পাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে গ্রীষ্মকালেও ফলবে শীতকালীন সবজি। ফলে সবজি চাষে যেমন বৈচিত্র্য আসবে, তেমনি অনেকেই আয়ের নতুন উেসর সন্ধান পাবে।

গ্রিনহাউসের আদলে দেশীয় কৃষি ব্যবস্থাপনায় নতুন সংযোজন পলিনেট হাউস। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সামাল দিয়ে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ, রোগবালাইয়ের আক্রমণ প্রতিরোধ, বীজতলার মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং অসময়ের সবজি চাষসহ আধুনিক কৃষিকাজের জন্য পলিনেট হাউজের জুড়ি নেই। এর মাধ্যমে শীতকালীন সবজি যেমন গ্রীষ্মকালে উত্পাদন করা যাবে, তেমনি গ্রীষ্মকালের সবজিও শীতে উত্পাদন করা যাবে। এই পলিনেট হাউস প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারী বৃষ্টি, তীব্র তাপদাহ, কীটপতঙ্গ, ভাইরাসজনিত রোগ ইত্যাদির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিরাপদ থাকবে শাকসবজি এবং ফলমূলসহ সব ধরনের কৃষি উত্পাদন।

তবে এখনো সবখানে নেই পলিনেট হাউস। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে আপাতত সরকারি উদ্যোগে ক্লাইমেট স্মার্ট প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পলিনেট হাউস নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। তা দেখে কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, পলিনেট হাউসে ফসলের উত্পাদন ২০ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি পোকামাকড়ের আক্রমণও ৭০ শতাংশ কম। প্রাথমিকভাবে খরচ কিছুটা বেশি হলেও এতে উত্পাদন খরচ অত্যন্ত কম হবে। আর নিরাপদ ফসল উত্পাদন সহজ হবে।

পলিনেট হাউসের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের ফসল যেমন ফলবে তেমনি অফ সিজনে অন্যান্য সবজি উত্পাদন হবে। পাশাপাশি চারা উত্পাদনের সুযোগও তৈরি হবে। ফলে সারা দেশের মতো উপকূল অঞ্চলের সবজি চাষে বৈচিত্র্য আসবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কাজেই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৃষির টেকসই রূপান্তর ও আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পলিনেট হাউসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে।

খুলনা

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন