রাজশাহী-১ আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী শনিবার (৩০ ডিসেম্বর) গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মার চর অঞ্চলের ৯টি গ্রামে দিনভর গণসংযোগ করেন। এ সময় তিনি নূহ (আঃ), বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নৌকায় ভোট প্রার্থনা করে বিভিন্ন মোড়ে আয়োজিত অসংখ্য পথসভায় বক্তব্য দেন। এ ছাড়াও প্রায় দুই ডজনের মতো উঠান বৈঠকে অংশ নেন।
প্রতিটি পথসভা ও উঠান বৈঠকে উঠে আসে এলাকার প্রধান সড়কের দুরাবস্থা, শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ বঞ্চনা, চিকিৎসাসেবার অভাব ও বিদ্যুতের সমস্যার কথা। এ সময় নৌকার প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, 'আওয়ামী লীগ সভাপতি, জননেত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থ বারের মত দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। আগামী ৭ জানুয়ারি আমাকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে এমপি নির্বাচিত করলে চরের অধিববাসীদের সকল সমস্যা সমাধান করতে পারবো বলে আশা রাখি।' তিনি অবশিষ্ট প্রধান সড়ক পাকা করার, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাইমারি স্কুলের ব্যবস্থা, চরের ২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালের অনুরূপ মানের চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা ও চরের বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন।
পদ্মার দুর্গম চরে নৌকার প্রার্থীর গণসংযোগের খবর পেয়ে শনিবার সকালে ফটোসাংবাদিক আজাহার উদ্দিনের সঙ্গে নিয়ে রাজশাহী থেকে রওয়ানা হই। পথিমধ্যে মোবাইলে নৌকার প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কথামত আমরা গোদাগাড়ীর ফুলতলা খেয়াঘাটে পৌঁছে খবর পাই, দলবল নিয়ে প্রার্থী আগেই পদ্মা নদী পাড়ি দিতে শুরু করেছেন। এরপর পদ্মার বালু চরে আমাদের মোটরসাইকেল যাত্রা শুরু করে। খেয়া নৌকায় পদ্মা পার হয়ে আবার বালু চরে ধুলার রাজ্যে মাড়িয়ে মোটরসাইকেল এগিয়ে চলে। এভাবে টানা ১৩/১৪ কিলোমিটার পথ যাত্রার একপর্যায়ে চর নওসেরা হাবিলদার পাড়ায় নৌকার দুই শতাধিক মোটরসাইকেলের শোভাযাত্রায় চোখ আটকে যায়।
শোভাযাত্রার বহরের লোকদের মাধ্যমে স্থানীয় চর নওসেরা হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে কয়েকশ’ মানুষের জটলার মধ্যে নৌকার প্রার্থীকে গণসংযোগ করতে দেখা যায়। সেখানে মাদ্রাসার সুপার হাফেজ মাওলানা আবুল হোসেন এমপির কাছে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এ সময় এলাকাবাসী মাদ্রাসার সুপারের বক্তব্যে সমর্থন করেন। এরপর সেখান থেকে নৌকার প্রার্থী নছিমনে চেপে এবং কর্মী সমর্থকেরা দুই শতাধিক মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে প্রচারণা ও পথসভা শুরু করেন।
এরপর হাবিলদার পাড়া এবং উত্তর কানা পাড়ার আব্দুস সালামের বাড়ির সামনের পথসভায় বক্তব্য দেন নৌকার প্রার্থী। এরপর বিজিবির সাহেবনগর বিওপির দক্ষিণে হাইস্কুল ও প্রাইমারি স্কুলসংলগ্ন মাঠে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ উঠান বৈঠকে নৌকার প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী ছাড়াও গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অয়েজ উদ্দিন বিশ্বাস, চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আসগর আলী মাস্টার, চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য দেন। এই বৈঠকে চরের কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। এরপর নৌকার প্রার্থী চরের হাজীর মোড়, বাক্কারের মোড়, ভোবনপাড়া ঈদগাহ মোড় ও দিয়াবাড়ির চক এলাকায় পথসভা ও উঠান বৈঠকে বক্তব্য দেন।
রাজশাহী-১ আসনে নৌকা ছাড়াও আওয়ামী লীগের চারজন স্বতন্ত্র ও বিভিন্ন দলীয় মিলিয়ে মোট ১১জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে চরের পথ চলতে ওমর ফারুক চৌধুরীর নৌকার পোস্টার ও ব্যানার চোখে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। এরপর চিত্র নায়িকা শারমিন আক্তার নিপা মাহিয়ার ট্রাকের পোস্টারও চোখে পড়েছে। এ ছাড়া কাঁচি মার্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম রাব্বানীর পোস্টার কদাচিত চোখে পড়েছে। এ ছাড়া গোটা চরাঞ্চলে অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর পোস্টার চোখে পড়েনি।
পদ্মার চরের নৌকার প্রার্থীর গণসংযোগের আশেপাশে এই প্রতিবেদকের আলাপ হয় স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান, মুসা খান ও মিজানুর রহমানসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তারা জানান, পদ্মার দুর্গম চর অঞ্চলের গ্রামগুলো এখনো অবহেলিত। এখানে উন্নয়ন বলতে সরকারি অর্থায়নে এবং ওমর ফারুক চৌধুরীর উদ্যোগে নির্মিত কয়েক কিলোমিটার কংক্রিটের ঢালাইয়ের সড়ক এবং বেসরকারি সোলার সিস্টেমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা।
এ ছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে হাতে গোনা কিছু পাকা বাড়ি ও মসজিদ ছাড়া বাকি সব সেমিপাকা ও কাঁচা ঘর-বাড়ি। এলাকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি ও গবাদিপশু পালন। শিক্ষার জন্য কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয় থাকলেও কোনো কলেজ নেই। এই দুর্গম চরে চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতে বর্তমান সরকার প্রতিষ্ঠিত ২টি কমিউনিটি ক্লিনিকই ভরসা। পদ্মার এই চরের মানুষের চাহিদাও যে খুব বেশি তাও নয়। সহজ-সরল মানুষগুলো সামান্য প্রাপ্তিতেই খুশি।
দক্ষিণে অনুমান দেড় কিলোমিটারের মধ্যে ভারতীয় কাটাতারের বেড়া এবং উত্তরে পদ্মার চর দ্বারা বিভক্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি এই প্রতিবেদকের প্রশ্ন ছিল, ভারতীয় সীমান্তে কাটাতারের বেড়া অভিশাপ না আশির্বাদ?
জবাবে অধিবাসীরা জানালেন, ‘ভারত সরকার কর্তৃক সীমান্তজুড়ে নির্মিত কাটাকতারের বেড়া তাদের নির্বিঘ্নে-শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা দিয়েছে। কারো জমির গবাদিপশু ও ক্ষেতের ফসল যেখানে-সেখানে পড়ে থাকলেও কেউ আর নিয়ে যায় না। অর্থাৎ চুরি করে না। অথচ কাটাতারের বেড়া নির্মাণের আগে ভারতীয় দুর্বৃত্তদের ভয়ে চরের অধিবাসীরা সবসময় ভীত-সন্ত্রস্ত্র থাকতেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী সাবেক বিডিআর ও বর্তমান বিজিবি সদস্যরা তাদের প্রতিনিয়ত সন্দেহবশত সার্চ বা তল্লাশি করতো। এখন বিজিবিও কাউকে সন্দেহ বা সার্চ করে না বলেও জানান স্থানীয় অধিবাসীরা।
