দেশে রেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কারণ অরক্ষিত রেলক্রসিং। রেলক্রসিং দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়িতে থাকিলেও বিষয়টিকে কর্তৃপক্ষ সিরিয়াসলি গ্রহণ করিতেছেন বলিয়া মনে হয় না। সম্প্রতি দুইটি ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হইয়াছে। প্রথমটি ঘটিয়াছে যশোরে। সেই রেলক্রসিংটি বৈধ এবং এখানে একজন গেটম্যানও ছিলেন; কিন্তু ভোর সাড়ে ৫টার দিকে যখন দুর্ঘটনাটি ঘটে, তখন গেটম্যান ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন। বার উঠানো দেখিয়া একটি ট্রাক ক্রসিংয়ে উঠিয়া গেলে মুহূর্তের মধ্যে দ্রুতগতির ট্রেনের ধাক্কায় ট্রাকটি উড়িয়া যায়। ইহাতে নিহত হন চালক ও হেলপার উভয়েই। একইভাবে ময়মনসিংহে দিনে-দুপুরে ক্রসিংয়ে ট্রেন-ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত হয় চার জন। ইহার মধ্যে দুই জন ট্রেনের ইঞ্জিনের সম্মুখে দাঁড়াইয়া ভ্রমণ করিতেছিল বলিয়া জানা যায়। জানা গিয়াছে, এই ক্রসিংটির কোনো বৈধতা ছিল না।
দেখা যাইতেছে, বৈধ কি অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলি যেন মরণ ফাঁদে পরিণত হইয়াছে। যেইগুলি অবৈধ সেইখানে কোনো গেটম্যান থাকে না। সেইখানে একটি সাইনবোর্ড টানাইয়া দিয়া সতর্ক করা হইলেও চলাচলকারী মানুষের সেইদিকে অনেক সময় থাকে না কোনো ভ্রুক্ষেপ। আর বৈধ ক্রসিংগুলিতে গেটম্যান থাকিলেও সেইখানে নানা সমস্যা বিরাজমান। যেইহেতু তাহাদের অধিকাংশের চাকুরি স্থায়ী নহে, তাই দায়িত্ব পালনে অনেক সময় দেখা দেয় শিথিলতা। তাহাদের এই দায়িত্বহীনতার বলি হয় শত শত মানুষ; কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাহাতে তেমন কোনো টনক নড়ে না। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করিয়াই তাহারা ক্ষান্ত হন। সুপারিশ বাস্তবায়ন দূরের কথা, অনেক সময় তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখই দেখে না। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলিয়া সমগ্র দেশে ২ হাজার ৮৫৬টি লেভেল ক্রসিং রহিয়াছে। ইহার মধ্যে ১ হাজার ৩৬১টিরই অনুমোদন নাই বা অবৈধ। আবার বৈধ ১ হাজার ৪৯৫টির মধ্যে ৬৩২টিতে নাই কোনো গেটম্যান। বিষয়টি ভাবা যায়? এতগুলি অবৈধ রেলক্রসিং কীভাবে থাকিতে পারে? নাগরিকদের জীবন এইভাবে অনিরাপদ থাকিতে পারে না।
জানা মতে, গেটম্যান ছাড়া চলিতেছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৭৭১টি রেলক্রসিং। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন চট্টগ্রাম রেলওয়ে বিভাগের চট্টগ্রাম হইতে দোহাজারী পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ৪৭টিতেই গেটম্যান নাই। চট্টগ্রাম হইতে চাঁদপুর পর্যন্ত রেললাইন এলাকা লইয়া রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগ। এখন ইহার সহিত কক্সবাজার রেললাইন যুক্ত হওয়ায় এই বিভাগের পরিধি আরো অন্তত ১০০ কিলোমিটার বাড়িয়াছে। দিনদিন এই রেলপথে ট্রেনের সংখ্যাও বাড়িতেছে। এইভাবে রেললাইন ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়িলেও লেভেল ক্রসিংগুলিতে গেটম্যানের সংখ্যা কেন বাড়িবে না? এইখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় তাহা হইল, ৪০ কিলোমিটারে ৪৭টি লেভেল ক্রসিং থাকিবে কেন? প্রতি কিলোমিটারে একটি করিয়া লেভেল ক্রসিং কি মানা যায়? ঘনঘন লেভেল ক্রসিংয়ের কোনো প্রয়োজনীয়তা নাই। যদিও যত্রতত্র লেভেল ক্রসিং দেওয়ার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সরকারের চাপ থাকে; কিন্তু যাত্রী ও জননিরাপত্তার কথাও তো ভাবিতে হইবে। তাহারা অবৈধ রেলক্রসিং তৈরি করিলেও সেইখানে গেটম্যান নিয়োগের দায়িত্ব কে লইবে?
সমগ্র দেশে রেলওয়ের যেই চাহিদা এবং ইহার সম্পদ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা রহিয়াছে, তাহাতে এই প্রতিষ্ঠানকে আশানুরূপভাবে লাভজনক করা মোটেও অসম্ভব নহে। এমন একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের লোকোমোটিভ কিংবা জনবলগত ঘাটতি থাকিবে কেন? এই জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নের বিকল্প নাই। সুখবর হইল, রেলওয়ে নাশকতা প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষ আনসারের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছেন। রেলওয়েতে গত দেড় দশকে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নও সাধিত হইয়াছে। তাহার পরও আমরা যখন লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনার খবর পাই, তখন মর্মাহত না হইয়া পারি না। লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনা কীভাবে কাঙ্ক্ষিত হারে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহার ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবোচিত পদক্ষেপ লইতে হইবে।
