তাহাদের অন্তরে শুভবুদ্ধির উদয় হউক

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

একটি নূতন বত্সর আসে একটি গ্রন্থের না-লেখা অধ্যায়ের মতো, যাহা লিখিতে হইবে। এই কথা বলিয়াছেন আমেরিকার লেখক মোলোডি বিটি। আমরাও আমাদের লক্ষ্য স্থির রাখিয়া ২০২৪ সালের একটি ইতিবাচক অধ্যায় লিখিতে চাই। কোনো কোনো বত্সরের প্রভাব সমগ্র জীবন আমাদের সহিত আষ্টেপৃষ্ঠে লাগিয়া থাকে। রাষ্ট্রজীবনে এবং ব্যক্তিজীবনে কোনো কোনো বত্সর আসে পরমানন্দের হইয়া, আবার কোনো বত্সর আসে আতঙ্কের জলজ্যান্ত প্রতিমূর্তি হইয়া। ২০২৪ সালটির শুরুটি আমাদের জন্য যাহার পর নাই গুরুত্বপূর্ণ। ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনই কেবল নহে, যাহার রেশ ধরিয়া বত্সরের বাকি সময়ের তাপ-উত্তাপ নির্ভর করিবে। ইহার সহিত বিশ্বে চলমান বড় দুইটি সংঘাত ফিলিস্তিনি-ইসরাইল ও রাশিয়া-ইউক্রেনের পরিস্থিতি খুব বেশি ইতিবাচক হইবে বলিয়া মনে হয় না। বাংলাদেশের বৃহত্ প্রতিবেশী ভারতে এবং বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচনও হইবে ২০২৪ সালে। সুতরাং সমগ্র বিশ্বের জন্যই আজকের নূতন এই বত্সরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবজাতির বৃহত্ অংশের ভালো থাকা মন্দ থাকার নির্ভর করিতেছে এই সকল পরিস্থিতি মিলিয়াই।

সমস্যা হইল, শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা মনে করেন যে, জগতের সকল কিছুই কেবল তাহাদের জন্য। বিগত পনেরো শতক হইতে এখন অবধি যত বড় বড় গণহত্যা ও বর্ণবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হইয়াছে, তাহার নেপথ্যে রহিয়াছে সম্পদলুণ্ঠন, জাত্যভিমান ও শ্রেষ্ঠত্বের হীন মানসিকতা। এই মোড়লরা মনে করেন, অধিকতর শক্তিশালী জাতি বিস্তারের জন্য দুর্বলরা অবশ্যই তাহাদের পথ ছাড়িয়া দিবে অথবা তাহাদের সেই পথ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য করা হইবে। ইহা বিগত কয়েক শতকের কথা; কিন্তু দুঃখের বিষয় হইল, এই একবিংশ শতকের এক-পঞ্চমাংশে আসিয়াও আমরা দেখিতে পাই—ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাস, আমেরিগো-যুগের মানসিকতা এখনো বহাল তবিয়তে বিরাজ করিতেছে শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের অন্তরে। বহিরাঙ্গে তাহারা খোলস পালটাইলেও ভিতরে ভিতরে শ্রেষ্ঠত্বের অহং যায় নাই তাহাদের। এই জন্য তাহারা অন্যদের হুমকি দেয় মাটিতে মিশাইয়া ফেলিবার; এমন ভয়ানক উচিত শিক্ষা দেওয়ার দম্ভ দেখায় যে, তাহাদের শরীরী ভাষা বলিয়া দেয় অন্যদের তাহারা ধূলিসমান জ্ঞান করেন মাত্র। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’—ইহাই যেন শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের নিকট সবচাইতে বড় ‘মিথ্যা’। এই কারণে বিশ্বে শান্তি আনিতে এত বেশি যুদ্ধবিগ্রহ ধ্বংসের ঘটনা ঘটিয়াছে যে, মোড়লদের কথিত শান্তি আনয়নের বিষয়টি এখন প্রহসনে পরিণত হইয়াছে। বিগত বাইশ-তেইশ অবধি আমরা এমনটাই দেখিয়া আসিয়াছি। জগত্ নিয়ত পরিবর্তনশীল। নূতন সময়ে পরিবর্তনের সেই ঢেউ কখনো সখনো যেন সুনামি হইয়া টলাইয়া দেয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন। পরিবর্তনের স্রোতেই বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য ভাঙাগড়া চলিতেছে। মোড়লদের হাতে এখনো যেই পরিমাণ অস্ত্র ও পরমাণু বোমা রহিয়াছে, তাহা দিয়া সমগ্র বিশ্বকে পুরাপুরি ধ্বংস করিয়া ফেলা যায় কমপক্ষে ৩৮ বার। সেই বারুদের স্তূপের মধ্যে তেইশ হইতে আমরা যাত্রা শুরু করিলাম চব্বিশের দিকে।

প্রবাদে রহিয়াছে—তমসো মা জ্যোতির্গময়। অর্থাত্ অন্ধকার হইতে আমাদের আলোর দিকে লইয়া চলো। নূতন বত্সর মানেই নূতন আশা। চাষা বাঁচেন আশায়। উন্নয়নশীল দেশের মানুষ শত মন্দার মধ্যেও আশার বাতি জ্বালাইয়া রাখিতে ভোলেন না। সেই কারণে অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, ভূ-কূটনীতির জটিল হিসাবনিকাশের মধ্যেও নূতন বত্সরে নূতন বোধোদয় ঘটিবে নেপথ্য নাট্যকারদের—এমনটি কামনা করাই হয়। আমরা আশা করিব, নূতন দিনের সূর্য আমাদের পূর্বের গ্লানি, নির্বুদ্ধিতা, নৃশংসতা, অমানবিকতাকে দূর করিবে। এই জন্য শ্রেষ্ঠত্ববাদী তথা বিশ্ব মোড়লদের প্রকৃত সদিচ্ছা প্রয়োজন। নিজেদের মতো অন্যদেরও তাহাদের ‘মানুষ’ বলিয়া মনে করিতে হইবে। তাহারা নিজেরাও শান্তিতে থাকুক, অন্যদেরও শান্তিতে থাকিতে দিক। তাহাদের অন্তরে শুভবুদ্ধির উদয় হউক।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন