দেশে চিকিত্সার উন্নতি হইয়াছে, ঔষধশিল্পের বিস্তার ঘটিয়াছে, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি পাইয়াছে, তথাপি অনেকটা অপ্রতিরোধ্য গতিতে দেখা দিতেছে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব। সরকারি জরিপের তথ্য সেই কথাই বলিতেছে। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি ১৮টি ক্যাটাগরির রোগের চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে জনসংখ্যার শতকরা হারে, যেইখানে সর্বোচ্চ ছয়টি ক্যাটাগরির রোগের হার ৭০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অবশিষ্ট ২৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত। চিন্তার বিষয় হইল, দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলির মধ্যে অধিকাংশই অসংক্রামক রোগ। জনস্বাস্থ্যবিদগণ আশঙ্কা করিতেছেন, পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হইয়া উঠিতে পারে। বিশেষত ছয়টি রোগে রীতিমতো কাবু হইয়া পড়িতে পারে অধিকাংশ মানুষ, যাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িতে পারে দেশের কর্মসংস্থান ও উপার্জনের ক্ষেত্রে। অসংক্রামক রোগের প্রকোপ ইতিমধ্যে জনগণকে ভোগাইতে শুরু করিয়াছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আসা রোগীদের তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করিলেই বিষয়টি প্রতিভাত হইয়া উঠে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়াছে, দীর্ঘমেয়াদি বড় রোগগুলির মধ্যে বিশেষত গ্যাস্ট্রিক-আলসারের প্রকোপ অধিক। নারীদের চাইতে পুরুষদের এই রোগ অধিক আক্রান্ত করিতেছে। অন্যদিকে হূদেরাগ ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়িতেছে ক্রমবর্ধমান হারে। শ্বাসতন্ত্রের রোগীও পরিলক্ষিত হইতেছে ব্যাপকভাবে। এই সকল রোগের পাশাপাশি ভোগাইতেছে ডায়াবেটিস। ইহা একসময় মহামারি আকার ধারণ করিতে পারে। মূলত অনিয়ন্ত্রিত ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে এই সকল অসংক্রামক রোগের বিস্তার অধিক বাড়িয়া গিয়াছে। খাদ্য গ্রহণে অনিয়ম এবং ধূমপানের ন্যায় বিষয়গুলি রোগের বিস্তারকে কয়েক গুণ বাড়াইয়া তুলিতেছে। এই অবস্থার উত্তরণ জরুরি। এই ক্ষেত্রে কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, আরো কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কার্যক্রম অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি শিশুকাল হইতেই মানুষের আচরণগত পরিবর্তন ঘটাইতে হইবে। খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাও অনেক বেশি জরুরি। কায়িক পরিশ্রম বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিকর দ্রব্যাদি গ্রহণ বন্ধেও নজর দিতে হইবে। অন্যথায় চিকিত্সার সুফল পাওয়া দুরূহ হইবে।
উন্নত বিশ্বে আমরা লক্ষ করিয়া থাকি, প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রহিয়াছে। সত্যি বলিতে, রোগ ঠেকাইবার পদক্ষেপের দিকে নজর না দিলে অসংক্রামক-সংক্রামক কোনো রোগের বিস্তারই রোধ করা যাইবে না। বরং রোগীর সংখ্যা বাড়িতে থাকিবে হুহু করিয়া। শত শত হাসপাতাল তৈরি করিয়াও কোনো লাভ হইবে না। আক্রান্ত ও মৃত্যু উভয়ই বাড়িতে থাকিবে।
বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, সংক্রামক রোগ ঠেকানো আজিকার দিনে খুব একটা কঠিন না হইলেও অসংক্রামক রোগ ঠেকানো ক্রমশ কঠিনতর হইয়া পড়িতেছে। ইহার কারণ, মানুষের মধ্যে অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রহিয়াছে। মূলত কাজ করিতে হইবে এই জায়গাতেই। কোভিড-১৯ মহামারি-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) আশঙ্কার কথা আমরা স্মরণ করিতে পারি। হু হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছিল, সতর্ক-সচেতন না হইলে বিশ্বব্যাপী নিয়মিত রোগব্যাধির সহিত বৃদ্ধি পাইবে নূতন নূতন রোগবালাই। হুর কথাই আমরা কি আদৌ কর্ণপাত করিয়াছি? স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মানুষের মধ্যে অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াইবার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছে বলিয়া আমরা শুনিয়াছি। দেশের উপজেলা হাসপাতালগুলিতে অসংক্রামক রোগ কেন্দ্র খোলা হইয়াছে। অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় তৈরি করা হইয়াছে বিশেষ নির্দেশিকা। হূদেরাগ চিকিত্সায় নীতিনির্দেশনা (প্রটোকল) তৈরির পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের বিষয়ে চিকিত্সক-নার্সসহ মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হইয়াছে। সর্বোপরি চিকিত্সার পরিসর বাড়ানো হইতেছে। উপরন্তু নূতন বত্সরে দেশব্যাপী মাঠ পর্যায়ে অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত কর্নার চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে। এই সকলের পাশাপাশি অবস্থার উত্তরণে আরো দূরদর্শী ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হইবে বলিয়া আমরা মনে করি। এই জন্য খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, তৈল ইত্যাদি পরিহার করিতে হইবে। শহর-গ্রাম সর্বত্র হোটেল, রেস্টুরেন্ট এমনকি ফুটপাতের খাবারগুলি অবশ্যই স্বাস্থ্যকর ও সুলভ হইতে হইবে।
স্মর্তব্য, চিকিত্সা ব্যয় মিটাইতে গিয়া প্রতি বছর ৬২ লক্ষাধিক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলিয়া যায়। ব্যয় মিটাইতে পারিবে না বলিয়া ১৬ শতাংশ খানা (পরিবার) চিকিত্সা নেওয়া হইতে বিরত থাকে। অসংক্রামক রোগ কী মাত্রায় ভোগান্তির কারণ হইয়া উঠিতেছে, তাহা ইহা হইতে সহজে অনুমেয়। সুতরাং, অসংক্রামক রোগের লাগাম টানিতে কার্যকর ও টিকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
