প্রাণীকুলের জীবন যাপনে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বৃক্ষ তরুলতা, জল-জলাশয়, বায়ু ও তৃণ থেকে শুরু করে ভূ-গর্ভস্থ পদার্থ মানুষের জীবন যাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের অদূরদর্শিতার হাত অনেক ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য হুমকির সম্মুখীন হয়। গাছ, তরুলতা মানুষের আবাসস্থলের সন্নিকটে অবস্থান থাকায় আবাসন ব্যবসায় বৃক্ষের ভূমিকা অনন্য। বৃক্ষ অতিরিক্ত শব্দদূষণ ও তাপমাত্রা শোষণপূর্বক পরিবেশকে শুদ্ধ ও নির্মল রাখে।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশের বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৃক্ষনিধন। নির্বোধ-অর্বাচীন ও অর্থলিপ্সু কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নির্বিচারে সুন্দরবন, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, মধুপুরের বন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল উজার করত ফার্নিচারের উপকরণ এবং হাজার হাজার ব্রিক ফিল্ডে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ঢাকার বায়ুদূষণের মূল উত্স হলো ধুলা ও ধোঁয়া। অপরিকল্পিত ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণকাজ থেকে ধুলা, ফিটনেসবিহীন পুরোনো গাড়ি-বাস থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং শিল্পকারখানা থেকে নিঃসারিত কার্বন ও অপরিশোধিত বর্জ্য প্রতিনিয়ত পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ঢাকা পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে অপরিকল্পিত ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা থেকেও নির্গত হচ্ছে ধোঁয়া। সড়ক ও জনপদ বিভাগের রাস্তা মেরামত-ওয়াসার পাইপ লাইন বসানোর জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি কাজে সমন্বয়হীনতা এবং প্রাকৃতিক জলভূমি দখল ও ভরাট ঢাকার পরিবেশ দূষিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিরিখে মহানগরে ২৫ শতাংশ এলাকা বৃক্ষ, তরুলতা আচ্ছাদিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। ২০১৯ সালের স্যাটেলাইটের জরিপ অনুযায়ী ঢাকা মহানগরের মাত্র ৮ শতাংশ এলাকাকে গ্রিন জোন এরিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বৃক্ষ পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে এবং শব্দদূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। পরিবেশবিদদের মতে এক হেক্টর বন ১০ ডেসিমল শব্দ হ্রাস করতে পারে।
বৃক্ষ নিধনের ফলে প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ ও তাপদাহ বৃদ্ধি পায়। ঢাকার সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থা ঢাকা মহানগরের রাস্তা উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির অজুহাতে প্রায়শই বৃক্ষ নিধন করে। সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ঢাকা শহরের প্রায় সব পার্ক ও মাঠগুলো পরিকল্পিতভাবে লাখ লাখ বৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যা করে ঢাকা শহরকে সবুজায়নের মাধ্যমে দূষণমুক্ত ও অপরূপ সবুজ ঢাকায় রূপান্তর করতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ বাড়ির আঙ্গীনায় ও ছাদে বৃক্ষ রোপণ এবং নিয়মিত পরিচর্যা করে তাহলে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি ভয়াবহ বায়ুদূষণ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারে।
২০১৯ সালে ১৫ মে ‘ফিলিপাইনে গ্র্যাজুয়েশন লিগ্যাসি ফর দ্য এনভায়রনমেন্ট অ্যাক্ট’ প্রণীত হয়। নতুন এই আইনে কোনো শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করতে হলে কমপক্ষে ১০টি করে গাছ লাগাতে হবে। তবে এ গাছ লাগাতে হবে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে। বাংলাদেশেও অনুরূপ আইন প্রণয়ন করা অতীব জরুরি বলে পরিবেশবিদেরা মনে করেন। বাংলাদেশে বৃক্ষ রোপণে বিশেষ অবদানের জন্য ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পুরস্কার’ পরিধি ও সম্মানির পরিমাণ আর্কষণীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার এর মতে ‘ভালো’ মানের বায়ুর ক্ষেত্রে স্কোর শূন্য থেকে ৫০। ৫১ থেকে ১০০ হলে তাকে ‘মধ্যম’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ মানের বায়ু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোরকে ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয়। স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু বলে মনে করা হয়। আর স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে তাকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু বলে মনে করা হয়। ৩০১ থেকে তার ওপরের স্কোরকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়। জানুয়ারি ২০২৩, বায়ুদূষণে বিশ্বে টানা ৫ দিন ছিল ঢাকা শীর্ষে। ২৬ জানুয়ারি একিউআইয়ের প্রতিবেদন মোতাবেক প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ২৭৬ মাইক্রোগ্রাম দূষণে ঢাকা শীর্ষে অবস্থান করে, ১৯৭ স্কোর নিয়ে করাচি দ্বিতীয়। ২৪ নভেম্বর ২০২৩, একিউআইয়ের প্রতিবেদনে ৩২৩ স্কোর নিয়ে বিশ্বে বায়ুদূষণের শীর্ষে ঢাকা, যা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত। ৩০৬ স্কোর নিয়ে দিল্লি ও লাহোরের অবস্থান দ্বিতীয়। ১১ ডিসেম্বর ২০২৩, একিউআইয়ের প্রতিবেদনে ৩২১ স্কোর নিয়ে বিশ্বে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান প্রথম এবং ২২৪ স্কোর নিয়ে কুয়েত সিটি দ্বিতীয়
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ ম্যানগ্রোভ শোভিত সুন্দরবন যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। সিডর-আইলার ভয়াবহতা থেকে সুন্দরবন লাখ লাখ মানুষের জীবন এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি রক্ষা করে। এ ক্ষেত্রে সুন্দরবনের আত্মত্যাগ অকল্পনীয়। প্রায় ৫ লাখ মানুষের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন এই সুন্দরবন। রামপাল, পায়রা ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্প সুন্দরবন এবং পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রতিটি দেশের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অত্যাবশকীয়। ২০১৮ সালে এফএও-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মোট ১৩.৫০ শতাংশ বনভূমি রয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় সুন্দরবনকে অন্তর্ভুক্তের পর ৩০ আগস্ট ১৯৯৯ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টের চারদিক এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করে।
আমাজন বিশ্বের সববৃহত্ উষ্ণ মণ্ডলীর বনভূমি। সমগ্র পৃথিবীর ৫০ শতাংশই রেইন ফরেস্ট আমাজনের এই বিচিত্র বন ভূমিতে। পৃথিবীতে মোট উত্পাদিত অক্সিজেনের ২০ শতাংশ উত্পাদিত হয় আমাজন বন থেকে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও গভীরতম দীর্ঘতম নদী (প্রায় ৬৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ কিলোমিটার প্রশস্ত)। আমাজন নদীই পৃথিবীর বৃহত্তম বনাঞ্চল আমাজনের জীবনী শক্তি। মোট ৯টি দেশ জুড়ে আমাজন বন বিস্তৃত। আমাজন বনের ৬০ শতাংশ ব্রাজিলে, ১৩ শতাংশ পেরুতে, ১০ শতাংশ কলোম্বিয়াতে অবস্থিত। অবশিষ্ট অংশ বলিভিয়া, গায়ানা, ইকুয়েডর এবং সুরিনামের আওতাধীন।
সাড়ে ৫ কোটি বছর আগে ইউজুন যুগে আমাজন জঙ্গলের উত্পক্তি হয় যাহা সমগ্র পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত। আমাজন জঙ্গল উত্পক্তি হওয়ার পর তার পরিপূর্ণ রূপ পেতে প্রায় ২ কোটি বছর সময় লেগে যায়। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীবিধৌত বিশাল বনাঞ্চল প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এই বনাঞ্চল বাংলাদেশের তুলনায় আয়তন বিবেচনায় ৪০ গুণ বড় এবং ভারতের তুলনায় পাঁচ গুণ বড়। তন্মধ্যে ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার বনাঞ্চল মূলত আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। এখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির পাখি এবং ৪০ হাজার প্রজাতির বৃক্ষসহ মোট ৩৯০ বিলিয়ন বিভিন্ন বৃক্ষের আবাসস্থল রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরতম ও আকর্ষণীয় ম্যাকাও পাখি এই বনভূমিতে দেখা যায়। আমাজন জঙ্গলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আমাজন নদী, যা পেরুর অ্যান্ডিজ পবর্তমালা থেকে উত্পক্তি হয়েছে। এটা বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। এ বিষয়টি অনুধাবন করা কঠিন যে, এত বড় একটি নদীর ওপর কোনো সেতু নেই। নদীর দুই পাশে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষের বসবাস। যারা নৌকার সহায়তায় নদীর দুই পাশে পারাপার হয়। আমাজন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত এ নদীর সঙ্গে ১০০টির বেশি শাখানদী যুক্ত হয়েছে। আমাজন নদী পাঁচটি দেশ অতিক্রম করে অবশেষে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার কিউবিক লিটার পানি অবমুক্ত করে আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয় (সূত্র :টাইমস অব ইন্ডিয়া)।
রহস্যময় ও বিস্ময়কর বিষয় হলো আমাজন নদীর পানি ফুটন্ত হওয়ায় তাকে ফুটন্তনদী বলা হয়। এর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৯৩-১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জারগাভালের লেখায় এই ফুটন্ত নদীর কথা উল্লেখ আছে। এখানে বিশাল মানুষখেকো সাপ ও গাছ এবং মানুষখেকো পিরানহা মাছের কথা উল্লেখ করেছেন।
ব্রাজিলের কট্টোর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জইর বলসনারের শাসন আমলে ২০১৯-২০২২ পর্যন্ত আমাজনের ৩৫,১৯৩ বর্গ কিলোমিটার বন পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়। প্রেসিডেন্টের মূল লক্ষ্য ছিল আমাজনের বনাঞ্চল ধ্বংস করে খনিজ সম্পদ আহরণ করা, সয়াবিন চাষের জন্য কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং গোচারণভূমি বৃদ্ধি করা। অদ্যাবধি প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার গোচারণ ভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুলা আমাজন রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। জাতীয় মহাকাশ সংস্থার স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে ২০২৩ সালেন জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ১৯৮৬ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। যা গত বছরে একই সময়ে ধ্বংসের তুলনায় অর্ধেক এবং বিশ্ববাসীর জন্য সুখবর বলা যায়।
প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী সান্দ্রা মিরনা দিয়াজ বলেন, জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি সংকুচিত হচ্ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অনেক ধরনের বিলুপ্তির সংবাদ সামনে আসবে। সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলার জন্য বিশ্ব জুড়ে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে কাজ করতে হবে (সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান)।
বৃক্ষ আমাদের পরিবেশের বিশ্বস্ত বন্ধু। জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন ও বনাঞ্চল ধ্বংসের প্রতিবাদে আমাদেরকে আরো সোচ্চার হতে হবে। সবুজ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে সামাজিকভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করে একটি সুন্দরতম বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা আমাদের প্রত্যেক নাগরিকের পবিত্র ও নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় চার নেতা পরিষদ
