২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও কতিপয় ভবিষ্যদ্বাণী

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:২৫

নূতন বত্সরকে তুলনা করা যায় একটি খালি ডায়ারির সঙ্গে, যেইখানে কলম থাকে ব্যক্তির হাতে; ব্যক্তি নিজের ইচ্ছেমতো গল্প লিখিতে পারেন ডায়ারির পাতায় পাতায়। দেখিবার বিষয়, কী গল্প লিখা হইতেছে—সুন্দর ও কল্যাণের গল্প, নাকি ধ্বংসের আখ্যান। সদ্য যাত্রা করা ২০২৪ সালে বিশ্ব ডায়ারির পাতা জুড়িয়া ভালো কিছু লিখা হইবে কি না, তাহা লইয়া আশঙ্কা হইতেছে। পরিস্থিতি বলিতেছে, বত্সরটি সুখকর হইবে না! বরং অগ্নিগর্ভ হইয়া উঠিতে পারে বৈশ্বিক অঙ্গন। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়া যেই উত্তপ্ত পৃথিবীর পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়, ২০২৩ সালের পর চলতি ২০২৪ সালেও তাহা যে আমাদের জ্বালাইয়া মারিবে, নূতন বত্সরের এই কয়টি দিনেই তাহার আলামত স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে।

২০২৩ সালের একবারে শেষ দিকে রাশিয়ার একটি শহরে ইউক্রেনের বিমান হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ইহার জবাবে ইউক্রেনে বড় ধরনের হামলা চালায় রাশিয়া, যাহাতে বহু হতাহত হয়। ইহার পরের দিনগুলিতে তথা ২০২৪ সালের একেবারে প্রথম দিন হইতে বিশ্বব্যাপী রক্তপাত বাড়িয়া চলিয়াছে। লোহিতসাগরে মার্কিন হামলায় নিহত হইয়াছে ১০ হুতি যোদ্ধা। লাগাতার প্রাণ ঝরিতেছে গাজাযুদ্ধে। সর্বশেষ ঘটনাটি আরো বিধ্বংসী। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিশেষ শাখা কুদস বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পরপর দুইটি বিস্ফোরণে নিহত হইয়াছে শতাধিক মানুষ। আহত অন্তত দেড় শত জন। নূতন বত্সরের শুরুতে এই ধরনের বৃহত্ হামলা বিশ্বের জন্য বড় ধরনের অংশনিসংকেত নিঃসন্দেহে।

২০২৪ সাল জুড়িয়াই গাজায় যুদ্ধ অব্যাহত থাকিবে বলিয়া হুংকার দিয়া রাখিয়াছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তাহার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও দিয়াছে একই ঘোষণা। ইরানের উপরও সরাসরি হামলা চালাইবার হুঁশিয়ারি আসিয়াছে ইসরাইল হইতে। গত ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলা এবং ইহার পর গাজায় তেল আবিবের সর্বাত্মক ‘অপারেশন’ মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের জন্য ধ্বংসের বার্তা বহিয়া আনিয়াছে। করোনা মহামারির পর ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইহার পর ইসরাইল-হামাস সংঘাতের মধ্য দিয়া বিশ্ব প্রবেশ করিয়াছে এক অন্ধকার কানাগলিতে। ঘটনা এইখানেই থামিয়া নাই। নূতন নূতন ঘটনা ও ইস্যু ক্রমশ আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরিয়ে ধরিতেছে বিশ্বকে।

ভবিষ্যৎ লইয়া নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারা কঠিন কিংবা অসম্ভব বটে, কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী সকল ক্ষেত্রে অমূলক নহে। যেমন, ষোড়শ শতকের ফরাসি জ্যোতিষী নস্ত্রাদামুসকে সর্বকালের সেরা বলিয়া মান্য করা হয়। দাবি করা হয়, নস্ত্রাদামুসের মৃত্যুর কয়েক শত বছর পরও তাহার অনেক ভবিতব্য ফলিয়া গিয়াছে অক্ষরে অক্ষরে। হিটলারের উত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশ রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর সঠিক তারিখ, রাজা চার্লসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ইঙ্গিতের ন্যায় ঘটনা রহিয়াছে তাহার ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে। নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়িবে বিশ্ব। এই বত্সর অবতারণা ঘটিতে পারে বৃহৎ নৌযুদ্ধের!

আশঙ্কার বিষয় হইল, নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব চিত্র ইতিমধ্যে স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। আমরা দেখিতেছি, ক্রমেই উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে সমুদ্র। বিগত সপ্তাহগুলিতে, বিশেষত লোহিতসাগরে একের পর এক ব্যাবসায়িক জাহাজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হইতেছে। ঝামেলা চলিতেছে দক্ষিণ চীন সাগরে। এই সাগরের নিয়ন্ত্রণ কাহার হাতে থাকিবে, তাহা লইয়া ফিলিপাইনের সঙ্গে চীনের বিরোধ বাড়িতেছে ক্রমবর্ধনভাবে। অনুমান করা যায়, সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে একটি অনিবার্য সংঘাত বাধিতে পারে।

২০২৩ সাল বিশ্বকে বেশ ভোগাইয়াছে। যুদ্ধবিগ্রহের শিকারে পরণিত হইয়া বৈশ্বিক অর্থনীতির অবস্থা অতিশয় নাজুক হইয়া পড়ে বত্সরটিতে। এই বত্সরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ বা যুদ্ধাবস্থা চলিতেছে। বাড়িতেছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। আরো উদ্বেগের বিষয়, এই বত্সর হইল ‘নির্বাচনের বত্সর’—অধিকাংশ দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে ২০২৪ সালে। ফলে সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকিতেছেই। অর্থাৎ, আগামী দিনগুলিতে উন্নয়নশীল বিশ্বের অবস্থা যে আরো শোচনীয় হইয়া পড়িবে, তাহা সহজেই অনুমেয়। শান্তিকামী দেশগুলি যুদ্ধ না করিয়াও যাহাতে যুদ্ধের মধ্যে পড়িয়া না যায়, ইহাই আমাদের কামনা।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন