বাংলাদেশের সংবিধান সমবায় অর্থনৈতিক সেক্টরকে দ্বিতীয় সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বাধীনতার ৫২ বছর পর্যন্ত সমবায় সেক্টরের উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য নয়। দু-চারটি ব্যতিক্রমী সমবায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো উত্পাদন ও ভোক্তার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে উত্পাদক সমবায়ীদের গ্রহণযোগ্য মূল্য পেতে সহায়তা করছে।
ব্যক্তি উদ্যোগ ফার্মের মুরগি ও ডিম উত্পাদনে গত তিন দশকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দেশে বর্তমানে প্রায় সাত হাজার ক্ষুদ্র খামারি ফার্মের মুরগি ও ডিম উত্পাদন করছেন যা দেশের ধনী, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র্য শ্রেণির খাদ্যে প্রোটিনের সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। বলা হয়ে থাকে—ফার্মের মুরগি ও ডিম উত্পাদন, বিপণন ও পরিবহনের মাধ্যমে প্রায় লক্ষ লোকের আয় বৃদ্ধির একটা পথ খুলে গিয়েছে। এক্ষেত্রে সমবায়ের ভূমিকা রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ফার্মের মুরগি ও ডিম উত্পাদনকারী ক্ষুদ্র খামারিরা প্রতিবছরই একদিনের মুরগির বাচ্চা সংগ্রহে অস্বাভাবিকভাবে মূল্য বৃদ্ধির কারণে সংকটের সম্মুখীন হন। এক ডজনেরও কম সংখ্যক দেশি ও বিদেশি একদিনের মুরগির বাচ্চা উত্পাদনকারী নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেট করে ২০ টাকা মূল্যের ব্রয়লার ও লেয়ার বাচ্চার দাম ৮০ টাকা থেকে ৮৫ টাকা করে। প্রথমে তারা একদিনের বাচ্চা সরবরাহ হ্রাস করে পরে প্রতি সপ্তাহে ৫ টাকা থেকে ১০ টাকা—এভাবে বাড়াতে থাকে এবং এক-দুই মাসের মধ্যে ২০ টাকা মূল্যের বাচ্চা ৮০-৮৫ টাকায় ওঠে। এতে করে ক্ষুদ্র ডিম ও মুরগি উত্পাদনকারী খামারিদের উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। তারা ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে অসুবিধার সম্মুখীন হন। দাম বাড়লে চাহিদা হ্রাস পায়। সাধারণত আট সপ্তাহের ব্রয়লার বাচ্চা বিক্রি করা হয়। মূল্য বৃদ্ধির কারণে চাহিদা হ্রাস পাওয়াতে দেখা যায় আট সপ্তাহ পূর্ণ হওয়া ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে না। অবিক্রিত মুরগিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিনই খাবার ব্যয় করতে হয়। এতে মুরগির আকার ও ওজন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ক্রেতারা সাধারণত বেশি ওজনের বড় মুরগি কিনতে চান না। এতে খামারিরা লোকসানের সম্মুখীন হন। একইভাবে যে সব ক্ষুদ্র খামারি ডিম উত্পাদন করেন, বাচ্চার দাম বাড়ায় ডিমের উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। মূল্য বৃদ্ধি পেলে বাজারে চাহিদা হ্রাস পায়। ফলে ক্ষুদ্র ডিম উত্পাদনকারী খামারিরা সময়মতো উত্পাদিত ডিম বিক্রি করতে না পেরে লোকসানের সম্মুখীন হন। গত ত্রিশ বছরের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, প্রায় বছর পরপর এমন ঘটনা ঘটিয়েছে একদিনের বাচ্চা উত্পাদনকারী বৃহত্ ব্রিডাররা। অস্বাভাবিকভাবে একদিনের বাচ্চা মুরগির মূল্য বৃদ্ধি করায় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
দেশের ৭০০০ পোলট্রি খামারির উল্লিখিত সংকট থেকে রক্ষার জন্য সমবায় ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। প্রতিটি জেলায় একদিনের বাচ্চা উত্পাদনকারী একটি সমবায় সমিতি গঠন করা হলে জেলার ডিম ও মুরগি উত্পাদনকারী ক্ষুদ্র খামারিরা ঐ বাচ্চা উত্পাদনকারী সমবায় সমিতির সদস্য হবেন। সমিতিটি লেয়ার এবং ব্রয়লার মুরগির একদিনের বাচ্চা উত্পাদন করে সমিতির সদস্যদের কাছে যৌক্তিক মূল্যে নিয়মিত সরবরাহ করবে। এতে ক্ষুদ্র পোলট্রি খামারিরা হঠাত্ করে একদিনের বাচ্চার মূল্য বৃদ্ধির লোকসান থেকে রক্ষা পাবেন। তাদের ক্ষুদ্র খামারি ব্যবস্থা স্বচ্ছন্দে চালিয়ে যেতে পারবেন। এতে করে ২৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষুদ্র ফার্মের মুরগি ও ডিম উত্পাদনকারী খামারিরা টেকসই অবস্থার মধ্যে কাজ করবেন। ভোক্তাসাধারণও ডিম ও মুরগির আকস্মিক মূল্য বৃদ্ধির বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাবেন। প্রতিটি জেলায় একদিনের বাচ্চা উত্পাদনকারী সমবায় সমিতি গঠন এখন সময়ের দাবি।
