আজ বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে সাধারণ নির্বাচন ঘিরিয়া ঘটনার নানান ঘনঘটা হইয়া থাকে। নানান ধরনের অস্থিরতা, অশান্তি, অরাজকতার ভিতর দিয়া অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য কোনো কোনো মহল তাহাদের সর্বশক্তি ব্যয় করিতে মরিয়া হইয়া ওঠে। সেই কারণেই উন্নয়নশীল দেশে সুষ্ঠুভাবে একটি জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করাটা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের কাজ।
আজকের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কয়েকটি রাজনৈতিক দল বর্জন করিয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, প্রধানত যেই দলটি আজকের এই নির্বাচন বর্জন করিয়াছে, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বরের পূর্বে সেই দলটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ইহার অর্থ হইল, রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন সব ঘটনা ঘটে, যখন নূতন নূতন প্রধান দল ও প্রধান বিরোধী দলের আবির্ভাব হয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই ইহা কোনো স্থায়ী বিষয় নহে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন নির্বাচনও হইয়াছে, যখন একটি দল বাদে বাকি সব দল নির্বাচনটি বর্জন করিয়াছে। কিন্তু আজিকার এই দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২৮টি দলের ১৯৭০ জন প্রার্থী ৩০০টি আসনে নির্বাচিত হইবার মানসে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে। সুতরাং এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না বলিবার কোনো কারণ নাই। সরকার পরিবর্তন বা নূতন সরকার গঠনের জন্য নির্বাচন-পদ্ধতিই হইতেছে সর্বাধিক উত্তম পন্থা। সেই নির্বাচন সঠিক হউক বা অল্পবিস্তর প্রশ্নবিদ্ধ হউক না কেন—সাংবিধানিক ধারা বজায় রাখিতে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নাই। নির্বাচন না হইলে দেশে সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত থাকে না। উহা বিপজ্জনক। যাহারা বিপ্লবী নহে, বিদ্রোহী নহে, সন্ত্রাসীও নহে, বন্দুকের নলের গোড়ায় ক্ষমতায় যাহারা বিশ্বাসী নহে—তাহারা চিরকালই নির্বাচনের পক্ষে থাকেন। অন্যদিকে যাহারা নির্বাচন বর্জন করিয়া ভিন্ন পথ খুঁজিতে মরিয়া, তাহারা কতটা গণতন্ত্রপন্থি, সেই প্রশ্ন থাকিয়াই যায়।
নির্বাচন হইতেছে মানুষের নিকট রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের একমাত্র উপায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়া প্রমাণিত হয়, সরকার পাঁচ বত্সরে মানুষের জন্য কী করিতেছে। বিগত দিনে মানুষ কী পাইয়াছে, তাহারও পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া যায়। নির্বাচন না হইলে অসাংবিধানিক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হইবার ঝুঁকি থাকে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় শূন্যতা দেখা দেয়। ফলে জনগণের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, উন্নয়ন তথা ভাগ্যের পরিবর্তনও বিঘ্নিত হয়। সার্বিকভাবে নির্বাচনের বিকল্প নাই। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি পরিত্যাগ করিয়া আমাদের ঐক্যের রাজনীতি করিতে হইবে। কারণ, উন্নয়নের পূর্ব শর্তই হইতেছে ঐক্য। আজকে দেশ গড়াই হইতেছে রাজনীতির মূল কাজ। সুতরাং যাহারা ভোটার, তাহাদের কাঁধে অর্পিত হইয়াছে বিশাল দায়িত্ব। ভোটারদের মনে রাখিতে হইবে, তাহাদের নিকট এই গুরুদায়িত্ব অর্পিত হইয়াছে—আগামী পাঁচ বত্সর কে তাহাদের জনপ্রতিনিধি হইবে, কে তাহাদের পাশে থাকিবে, উন্নয়ন করিবে অথবা কে নিজেদের আখের গোছাইবে। যাহারা দেশের জন্য, মানুষের জন্য সংগ্রাম করিয়া আসিয়াছে—তাহাদের ভুলিয়া গেলে চলিবে না। কখনো কখনো কিছু লুটেরা দুর্নীতি করিয়াছে, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত্ করিয়া মাদকের কারবারি করিয়া কালোটাকার মালিক হইয়াছে। এই টাকা দিয়া যদি কেহ নির্বাচনি মাঠে নামিয়া কোটি কোটি টাকা বিছাইয়া ভোট কিনিতে চায়—জনগণ তাহার ভোটের সঠিন প্রয়োগের মাধ্যমে এই ধরনের লুটেরা কালোটাকার মালিকদের প্রতিহত করিতে পারিবে সহজেই। ইহাও নির্বাচনের একটি চমত্কার দিক। তবে এই জন্য ভোটারদের সচেতন থাকিতে হইবে। তাহার একটি ভোটের মূল্যও যে বিপুল—তাহা বুঝিতে হইবে।
বলা যায়, জীবনমানের সমৃদ্ধির জন্যই নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত লইতে হইবে। এই জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রয়োজন। সচেতন মানবগোষ্ঠীই পারে তাহাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে। সুস্থ সমাজ, নূতন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে যোগ্য জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচনের মাধ্যমে আজিকার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সার্থকতা লাভ করিবে—সেই প্রত্যাশা রহিল। জয় হউক গণতন্ত্রের।
