বহু আলোচনা-সমালোচনা, আন্দোলন-সংগ্রাম, জনদুর্ভোগ উপেক্ষা করে আজ ৭ জানুয়ারি ২০২৪ অনুষ্ঠিত হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণ করছে না। তারা তাদের দাবি-দাওয়া জানানোর পরেও ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকার তা মেনে না নেওয়ায় কিছু রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত সহিংস ও নাশকতামূলক কার্যক্রম শুরু করে। সর্বশেষ শুক্রবার রাতেও বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়, যাতে চার জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন করার অধিকার অবশ্যই রাখে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের জানমালের ক্ষতি করে, পুড়িয়ে মেরে জনদুর্ভোগ তৈরি করে দেশের সম্পদ বিনষ্ট করে আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো রাজনৈতিক দলেরই উচিত নয় দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম গ্রহণ করা, মানুষ হত্যা করা, রাষ্ট্রের সম্পদ বিনষ্ট করা এবং দেশের অর্থনীতি পঙ্গু করা। আমরা সাধারণ মানুষ এখনো জানি না, আগামী সরকার কীভাবে গঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে যেসব দল অংশগ্রহণ করছে, তারা তাদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই তাদের দলগত আদর্শ চিন্তা-চেতনা ধ্যান-ধারণার ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করে। নির্বাচনমুখী দলগুলো ইশতেহারে জনগণের কল্যাণের কথা তুলে ধরে যত চমক সৃষ্টি করতে পারে, নির্বাচনে জয়লাভের পর বাস্তবিক অর্থে সেই সব প্রতিশ্রুতির তেমনভাবে কোনো গুরুত্ব পায় না বা বাস্তবায়নের দিকে লক্ষ রাখে না। ক্ষমতার মসনদে বসে সব প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যায়। নির্বাচনের সময়ই শুধু জনগণের কাছে যেতে বাধ্য হয়, কিন্তু বৈতরণী পার হয়ে গেলে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে রাখে না। এর অবশ্য কারণও আছে। একদিকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার কথা ভুলে যায়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নানা সীমাবদ্ধতা থাকে প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সদ্য স্বাধীন দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র সময়ের পরিক্রমায় আজ একটা শক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক একটি সমাজকাঠামো গঠন, যার মধ্য দিয়ে দেশকে গড়ে তোলা যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানুষকে কেন্দ্র করেই তিনি সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার পটপরিবর্তন হয়ে যায়। বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে দেশ পরিচালনা করতে থাকে। কিন্তু দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকভাবে গতি আসে মূলত ২০১০ সাল থেকে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের শিরোনাম ছিল ‘দিন বদলের সনদ’। ‘ভোট ও ভাতের অধিকার দারিদ্র্যবিমোচনের হাতিয়ার’ স্লোগান নিয়ে দলটি এগিয়ে আসে। বিভিন্ন ধরনের সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত অবস্থা থেকে দেশকে পুনরুদ্ধার করে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। এতে মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। এ সময় আওয়ামী লীগ সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে অগ্রাধিকারভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তিসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে, যার উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয় ২০১৯ সালের মধ্যেই। এই সময়ে সামাজিক বিভিন্ন খাতে অগ্রগতি সাধিত হয়। মাথাপিছু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু বাড়ে। নারী ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস পায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়। ২০০৮ সালের ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল, তা হলো প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উত্স প্রতিবছর জনসম্মুখে প্রকাশ করা। বিষয়টি দেশের সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তারা তাদের সেই অঙ্গীকার থেকে দূরে সরে আসে এবং পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহার থেকে তা বাদ দেওয়া হয়। এই ইশতেহারে বলা হয়, সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। জনগণের জীবনযাত্রার ক্রমাগত মানোন্নয়ন, আয়-রোজগার বৃদ্ধি, খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একইভাবে ২০১৮ সালেও তারা আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে। এই ইশতেহারে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’, গণতন্ত্র, নির্বাচন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তোলা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মাদক নির্মূল, স্থানীয় সরকারে জনগণের ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা ইত্যাদি মৌলিক বিষয় স্থান পেলেও উন্নয়নের পথে এবং জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টির অন্যতম বড় বাধা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা দেশবাসীর অজানা নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে কিংবা ইশতেহারে উল্লেখিত সাংসদ, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উত্স প্রতি বছর জনসম্মুখে প্রকাশ করা হলে টিআইবি ইন্টারন্যাশনালের ২৭.১২.২৩ তারিখে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সম্পদের পরিমাণ ১৩৩ শতাংশ থেকে ১০৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির হিসাব দেখতে হতো না। জানা যায়, আজকের নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত প্রার্থীদের সম্পদের হলফনামায় ১৮ জন প্রার্থীর ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের পরিমাণ দেশবাসীকে বিস্মিত করেছে। যারা জনসেবার নামে জনগণের কল্যাণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং করবেন, তারাই সম্পদের পাহাড় গড়ে জনদুর্ভোগ তৈরি করে বৈষম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা সৃষ্টি করছেন। সংসদে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বেড়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সারারণ মানুষের জীবনে সীমাহীন দুর্ভোগ তৈরি করেতে পারে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে চারটি ভিত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া আছে। এবারের স্লোগান ‘স্মার্ট বাংলাদেশ : উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে ১১টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে যে দুটি বিষয় সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো, তা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে—দুর্নীতি, অর্থ পাচার রোধ, ঋণখেলাপির বিষয়টি ইশতেহারে থাকলেও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি বিষয়ের মধ্যে নেই। এ ছাড়া দেশে ২ কোটি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, তা-ও অগ্রধিকারের তালিকায় নেই। অথচ দুর্নীতি ও অর্থ পাচার দেশের সার্বিক উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা হয়ে কাজ করছে এবং অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ফেলেছে, যা সর্বমহলে আলোচিত একটি বিষয়। এ দুটি বিষয়কে অগাধিকারের তলিকায় রাখা হলে অন্য বিষয়গুলোর উন্নয়ন বা সমাধান সহজ হতো বলে অনেকেই মনে করেন। ২০১৮ সালের ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নেওয়ার পরও দুর্নীতি না কমে বরং আরো বহুগুণে বেড়েছে। এতে করে দেশে একটা বৈষম্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা আমাদের স্বাধীনতা ও সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কাজেই এসব বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যে রাজনৈতিক দল এগিয়ে আসবে, তাদের এ দেশের সাধারণ মানুষ স্বাগত জানাবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক মহাব্যবস্থাপক (অব.), বিসিক

