এমন একটা সময় ছিল, যখন স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সমালোচনামূলক খবরই ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কত কী-ই না শোনা যেত। মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় হতো অনিয়ম, পত্রিকার পাতা জুড়ে ভরে থাকত স্বাস্থ্যের নানা খাতে দুর্নীতি আর অপচিকিত্সার খবর। দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে সরকারি হাসপাতালে যাওয়াই ছিল কঠিন। হাসপাতালে পাওয়া যেত না ডাক্তার, ছিল না পর্যাপ্ত বেড। প্রায় কোনো হাসপাতালেই সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না। আইসিউ-সংকটে কত মানুষ মারা গেছে, তার হিসেব নেই।
সেই দিন এখন আর বেশি চোখে পড়ে না। পত্রিকার পাতা জুড়েও পাওয়া যায় না সেরকম কোনো অনিয়মের খবর। আজ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চোখে পড়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। প্রতিটি হাসপাতালেই করা হয়েছে ফুলের বাগান। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, কীভাবে যেন গত পাঁচ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। একদিকে করোনার দানবীয় তিনটি বছর সামলানো, অন্যদিকে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর নানাদিকে পরিবর্তনের নান্দনিক এক নীরব বিপ্লব। আর এই নীরব বিপ্লবে একেবারে সামনে থেকে দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার আস্থার প্রতীক মন্ত্রী এবং মন্ত্রীর সঙ্গে কিছু সত্ ও চৌকস কর্মকর্তা। একদিকে হাসপাতালের পরিবেশ পরিবর্তন হয়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে চিকিত্সক, নার্স, টেকনোলজিস্ট।
এই তো মাত্র পাঁচ থেকে সাত বছর আগেই সরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যা জেলায় ছিল মাত্র ৫০টি, উপজেলা হাসপাতালে ছিল মাত্র ১০টি করে। এখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য বিভাগের ফলপ্রসূ উদ্যোগে সরকারি হাসপাতালে সেবার মান বেড়েছে অনেক গুণ। একই সঙ্গে বেড়েছে রোগীর চাপও। দেশে এখন দিনে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ সরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিত্সাসেবা নিচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের প্রতি এই আস্থার কারণ, প্রতিটি হাসপাতালে চিকিত্সাসেবার যথাযথ মান বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরে হাসপাতালের সাধারণ শয্যাসংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে ৭২ হাজার হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতাল ৫০ থেকে ২৫০ শয্যা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়াও অন্য সব হাসপাতালেই বেড়েছে শয্যা।
আগে সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে একটি বেড পেতে হিমশিম খেতে হতো রোগীদের। তাই সারা দেশেই আইসিইউ বেড বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বর্তমানে আইসিইউ শয্যাসংখ্যা চার গুণ বাড়িয়ে মাত্র ৩৮১ থেকে ১৮৬০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া, প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ, জেলা সদর হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাপসাতালে ১০ থেকে ২০টি আইসিইউ শয্যা বাড়ছে। প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট বসানো হয়েছে, যা দেশের দরিদ্র্য মানুষের জন্য অমূল্য পাওয়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিনামূল্যে পাওয়া এসব সুবিধায় সাধারণ মানুষের কত যে উপকার হচ্ছে, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের ভরসা ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখানে বিনামূল্যে দেওয়া হয় ৩২ ধরনের ওষুধ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কমিউনিটি ক্লিনিকে নিরাপদ সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা চালু করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কমিউনিটি ক্লিনিক ধারণাকে ‘দ্য শেখ হাসিনা ইনিশিয়েটিভ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। এই কমিউনিটি ক্লিনিক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের বিশেষ করে দরিদ্র্য মহিলা ও শিশুদের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্বের ৭৬টি দেশও ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কমিউনিটি ক্লিনিকের এই ধারণাকে গ্রহণ করেছেন এবং তাদের নিজ দেশে এই সুবিধা চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছেন।
শত অভিযোগ মাথায় নিয়ে শত বছর পেরিয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানেও দিন বদলের গল্প শুরু হয়েছে। আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ বেড বৃদ্ধি, অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার, সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনসহ নানা উদ্যোগে ঢাকা মেডিক্যাল এখন রোগীদের কাছে আস্থার প্রতীক। ২ হাজার ৬০০ বেড থাকলেও রোগী ভর্তি থাকে ৪ হাজারের মতো। সেবার পরিধি বাড়াতে আধুনিক স্থাপনাসহ ঢাকা মেডিক্যালকে ৫ হাজার বেডের হাসপাতাল করার উদ্যোগ নিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা মেডিক্যাল ৫০০০ বেডের হয়ে গেলে চিকিত্সাক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা পাবেন ঢাকার মানুষজন। একইভাবে, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল ও জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউটসহ ঢাকার অন্যান্য প্রায় সব হাসপাতালেই দ্বিগুণ করা হয়েছে শয্যাসংখ্যা। শুধু তাই নয়, মাত্র ৫০ বেডের জেলা সদর হাসপাতালকে ২৫০ বেড এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০ বেড থেকে বাড়িয়ে ৫০ বেডে উন্নীত করা হয়েছে। এগুলো থেকে বিনামূল্যে দেশের লাখ লাখ মানুষ সেবা নিচ্ছেন, সুস্থ হচ্ছেন।
গত পাঁচ বছরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বড় সাফল্য হচ্ছে করোনা মোকাবিলা। প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিনই নির্দেশনা দিতেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে। বিশ্ব যখন করোনায় ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, বাংলাদেশ তখনো ছিল নিরাপদ ও দুর্ভিক্ষমুক্ত।
করোনার সময়টি নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ মানুষকে প্রায় ৩৭ কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হয় বিনামূল্যে। এক দিনেই দেওয়া হয়েছিল ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে টিকা। যা বিশ্বে এক বিরল রেকর্ড হয়ে আছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল দেশের তালিকায় বিশ্বে পঞ্চম আর দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপর অবস্থান বাংলাদেশের। টিকাদানে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সূদৃঢ়। টিকাদানে উন্নয়নশীল দেশের রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে ১১ ধরনের টিকা। ১২ মাসের কম-বয়সি শিশুকে টিকাদান ৭৬ ভাগ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৯৪ ভাগ হয়েছে। স্বীকৃতি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভ্যাকসিন হিরো পুরস্কার দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশের হাসপাতলগুলোতে এনসিডি কর্ণার চালু করে আরেকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই এনসিডি কর্ণার হিসেবে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক নানা রোগের নিয়ন্ত্রণ ও চিকিত্সায় সারা দেশে চালু করা হয়েছে ৩৪৪টি সেবাকেন্দ্র। এখান থেকে বছরে ১০০ কোটি টাকার ওষুধ বিনামূল্যে পাচ্ছেন রোগীরা।
মাত্র কিছুদিন আগেই ভারতে হয়ে গেল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলন। এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র দেশ হিসেবে কালাজ্বর নির্মূলের স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এছাড়া ২০২৩ সালেই মিলেছে আরেক রোগ ফাইলেরিয়া নির্মূলের স্বীকৃতিও। রোগ নির্মূলে কার্যকরী পদক্ষেপেই এসেছে এই সাফল্য।
চিকিত্সার জন্য এক জন রোগীকেও যেন দেশের বাইরে যেতে না হয়, টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছেন মন্ত্রী জাহিদ মালেক ও স্বাস্থ্য খাতের পুরো টিম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এসব যুগোপযোগী নানা উদ্যোগে দেশের স্বাস্থ্য সেবা খাত আজ এমন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে যে গত পাঁচ বছরের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নকে নির্দ্বিধায় বিগত ৪০ বছরের স্বাস্থ্যসেবার মানের সঙ্গে তুলনা করলে এতটুকুও অত্যুক্তি হয় না।
লেখক: জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়

