জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ঠেকাতে ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে রাজধানীর গোপীভাগে ৫ জানুয়ারি রাতে বেনাপোল এক্সপেস ট্রেনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় দুই শিশুসহ চার জন নিহত এবং ৩০ জনেরও অধিক আহত ও দগ্ধ হয়েছে।
বিএনপির আন্দোলন চলাকালে এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর ভোরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে চলন্ত অবস্থায় আগুনে মা-সন্তানসহ চার জন নিহত হয়। এর আগে ১৩ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে কাটা রেললাইনে লাইনচ্যুত হয়ে এক জন নিহত হয়। কক্সবাজারের রামুতে অবস্থিত ইউ চিট সান (রাখাইন) বৌদ্ধমন্দিরের মূল অংশে ৬ জানুয়ারি রাতে দুর্বৃত্তরা আগুন দেওয়ায় পুড়ে গেছে মন্দিরের কাঠের সিঁড়ি। নির্বাচনকে ভন্ডুল করতে হরতাল-অবরোধের নামে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাকে অগ্নিসংযোগ, বাস হেলপারদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, রেললাইন উপড়ে ফেলা এবং ট্রেনের বগিতে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপের মতো নাশকতা সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটেছে।
গত ২৮ অক্টোবরের সহিংস ঘটনাবলির পর বিএনপি ও তার সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় লাগাতার অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব পালনরত এক জন পুলিশ সদস্যকে হত্যাকাণ্ডের যে বীভত্স দৃশ্য দেশবাসী দেখেছে, তা তাদের আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আবার হাসপাতালে সংঘর্ষকারীদের হামলা সংঘর্ষের মাত্রাকে ভিন্ন খাতে নিয়েছে। এসব ঘটনাই কিন্তু আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গাড়িতে অগ্নিসংযোগের সময় পেট্রোলবোমাসসহ ধরা পড়ছে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সিআরআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, এসব নাশকতায় দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। ২০১৩-১৫ সালেও একইভাবে ব্যাপক নাশকতা হয় বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচির মধ্যে। অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পুড়ে মারা যায় কয়েক ডজন। চলমান আন্দোলনের প্রক্রিয়ায়ও একইভাবে পূর্বের মতো জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি জনদুর্ভোগও বাড়িয়েছে। এতে সাধারণ জনগণের মনে ভীতি জন্মেছে।
যারা হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন তাদের কৌশলের অভাব রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের আহ্বানে যখন জনগণ সাড়া দেয় না, তখন বুঝতে হবে ঐ রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে জনগণের বিশেষ আগ্রহ নেই। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নাশকতা ও সহিংসার আশ্রয় নিলে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেউলিয়াপনার পরিচয় মেলে। কোনো আন্দোলন কর্মসূচিই যাতে জনগণের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়, এর দায়িত্ব আন্দোলনকারী রাজনেতিক দলের নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে। সহিংসতা বা নাশকতা নয়, বরং অহিংসাই হোক রাজনীতিকদের মূল চেতনা। জনগণের বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের মতো কদর্যতা আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে চলার চিন্তা বাদ দিতে হবে। দেশের জনগণের ওপর ভরসা রেখে, তাদের আস্থা অর্জন করে রাজনীতি করতে হবে। ক্ষমতায় যেতে হলে এদেশের জনগণের কাছে যেতে হবে। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে কর্মসূচি দিতে হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে আড়ালে পরিকল্পনা করে সংঘাতের পথ বেছে নিলে যে কোনো দল সাধারণ জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
রাজনীতি হতে হবে কল্যাণমুখী ও জনবান্ধব। জ্বালাও-পোড়াও এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষ কখনোই ভালো চোখে দেখে না। সরকারের ভালো কাজের সমর্থনের মানসিকতা রাজনীতিবিদদের মধ্যে থাকতে হবে। রাজপথ বন্ধ করে নয়, বরং রাজপথ উন্মুক্ত রেখেই রাজনীতিবিদদের গঠনমূলক রাজনীতি করতে হবে। রাজনীতিকদের সর্বোচ্চ সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া জরুরি। জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে সর্বগ্রহণযোগ্য কর্মসূচি দিতে হবে। সাধারণ জনগণ এখন স্থিতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ নেতৃত্বে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তখনই তা বাস্তবে রূপ নেবে, যখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা একটি স্থিতিশীল কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারবে। রাজপথে অস্থিরতা সৃষ্টি করে শিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ রাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা অপকৌশল মাত্র। আন্দালনের নামে মানুষ হত্যাকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোও ভালো চোখে দেখে না। যারা এই নাশকতা করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।
উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী জোর করে কাউকে হরতাল পালনে বাধ্য করা বা হরতালের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, ভাঙচুর করা, মারামারি করা, জ্বালাও-পোড়াও-নাশকতা-সহিংসতার জন্য প্রচলিত আইনেই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য রয়েছে। দণ্ডবিধিসহ ঐসব অপরাধের শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। ২৮ বিএলডি (আপিল বিভাগ) ২০০৮, পাতা ৫৪-৬০-এ হরতালের বৈধতা বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের ৩৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়, বলপ্রয়োগে পালিত যে হরতাল সহিংসতা ছড়ায়, মৃত্যু ঘটায় এবং নাগরিকদের জানমালের ক্ষতিসাধন করে, সে হরতাল কেবল অবৈধই নয়, তা ঘৃণিত এবং প্রচলিত আইনে দণ্ডযোগ্য। ৪৫ অনুচ্ছেদে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বলপ্রয়োগে বা বলপ্রয়োগের ভয় বা সহিংসতা বা সহিসংতার ভয় দেখিয়ে কার্যকর হরতাল কেবল অবৈধ নয়, দণ্ডবিধিসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য ফৌজদারি আইনেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিএনপি ও সমমনাদের এই আন্দোলনে সহিংসতা ছাড়া নতুন কিছু না থাকায় জনপ্রিয়তা নিয়ে বিপাকে পড়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও কোনো নেতাকর্মী কিন্তু মাঠে থাকছেন না। এবারের নির্বাচনেও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ভোট বন্ধের বহুবিধ পরিকল্পনা উপেক্ষা করে শ্রেণি-পেশা- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট প্রদান করেছে। একটি বড় রাজনৈতিক দল ভোট থেকে বিরত থাকার পরও ৪০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি যথেষ্ট সাফল্য বলা যায়।
বিএনপির উচিত ছিল নাশকতা ও সহিংসতার পথ পরিহার করে নির্বাচন প্রক্রিয়ার গণতান্ত্রিক ধারা অনুসরণ করে এগিয়ে আসা। কারণ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার স্বচ্ছ, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও নির্বাচনে স্বচ্ছতার বিষয়ে বারবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। তাছাড়া এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশিদের তীক্ষ নজরদারি ছিল। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়। কিন্তু তাদের স্ববিরোধী রাজনীতিকরা দুর্বল শ্রেণির মনে করে ভুল করেন। তাদের একথা মনে রাখতে হবে, শান্তিপ্রিয় বলেই তাদের সহনশীলতাও অনেক বেশি। যারা সহিংস রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করে, সাধারণ মানুষ তাদের সমর্থন করে না।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিরোধী দলগুলো ছায়া সরকার গঠন করে। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তারা প্রংশসা করে এবং সরকার কোনো কাজে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে সেটি কীভাবে করা গেলে ভালো হতো সেই পথের সুপারিশ করে। কিন্তু আমাদের দেশে ঘটে ঠিক উলটোটি। সরকার যতই ভালো কাজ করুক না কেন, সেগুলোকে কতটা ছোট করে দেখানো যায়, তার একটি প্রতিযোগিতা আমরা লক্ষ করি। এর সঙ্গে গুজব, অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের মতো নেতিবাচক বিষয়গুলো তো থাকেই। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এমন ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
লেখক :শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

