ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ চলিতেছে তিন মাসের অধিক সময় ধরিয়া। ভয়াবহ এই যুদ্ধে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা মৃত্যুপুরী হইয়া উঠিয়াছে। অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ইসরাইলের ভয়াবহ হামলায় নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ২৩ হাজার ছাড়াইয়া গিয়াছে। আহত হইয়াছেন আরো প্রায় ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি। দুঃখজনক হইল, নিহতদের প্রায় অর্ধেকই শিশু। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীও রহিয়াছেন নিহতদের মধ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, ‘গাজা উপত্যকায় গড়ে প্রতি ১০ মিনিটে একটি শিশু নিহত হইতেছে।’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করিয়া দিয়া তিনি বলিয়াছেন, ‘গাজায় কোথাও এবং কেউ-ই নিরাপদ নহে।’ জাতিসংঘ আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া বলিয়াছে, ‘গাজার ১১ লক্ষ শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে।’ এইখানে আসলে বসবাসের কোনো পরিস্থিতি অবশিষ্ট নাই। গাজার ব্যবস্থাপনাকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভাঙিয়া পড়িয়াছে। হাসপাতালগুলি পরিণত হইয়াছে ধ্বংসস্তূপে। ফলে বাসিন্দারা নিরাপত্তা, খাবার, চিকিত্সা ও ঔষধের তীব্র অভাবে ভুগিতেছে। এই সকল সংবাদ আমাদের যাহার পর নাই ব্যথিত ও মর্মাহত করে।
গত বত্সরের ৭ অক্টোবর হইতে গাজায় শুরু হওয়া এই যুদ্ধে নিহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যাই অধিক। পাশাপাশি বহু নারী ও শিশু হামলায় আহত হইয়া বরণ করিয়াছেন পঙ্গুত্ব। প্রায় ১ হাজার শিশু তাহাদের একটি বা উভয় পা হারাইয়াছে বলিয়া জানাইয়াছে সেভ দ্য চিলড্রেন। বিস্ফোরণে আঘাতের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মৃত্যুর হার প্রায় সাত গুণ বেশি; কারণ, তাহারা আঘাতের প্রতি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। উপরন্তু, গাজায় চিকিত্সা সরঞ্জাম ও নিত্যপণ্যের তীব্র ঘাটতির কারণে চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হইতেছে ইসরাইলি হামলায় আহত বেশির ভাগ শিশু। ফিলিস্তিনি সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক জেসন লি বলিয়াছেন, ‘এই যুদ্ধে শিশুদের দুর্ভোগ অকল্পনীয়। শিশুদের হত্যা ও পঙ্গুত্ব একটি গুরুতর লঙ্ঘন, যাহা নিন্দার যোগ্য এবং অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহি করিতে হইবে।’ এই সংঘাত পুরোপুরি এড়ানো যাইত, কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাহা আজও অব্যাহত রহিয়াছে।
এই পরিস্থিতিতে গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়াইয়া যাওয়া ঠেকাইতে ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিতেছে বলিয়া খবর পাওয়া যাইতেছে। এই লক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী মধ্যপ্রাচ্য সফরে রহিয়াছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। জর্ডান, তুরস্ক, গ্রিস, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি সফর শেষে এই লেখা পর্যন্ত ইসরাইলে অবস্থান করিতেছিলেন তিনি। সৌদি আরব সফর শেষে ব্লিনকেন জানান, গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী সরকার ও পুনর্গঠন লইয়া পরিকল্পনা তৈরিতে কাজ করিতে রাজি হইয়াছে তুরস্কসহ আরব দেশগুলি। এই সংবাদ আশাব্যঞ্জক বটে। তবে উদ্বেগের বিষয় হইল, ব্লিনকেনের সফরের প্রাক্কালে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত হইয়াছেন আড়াই শতাধিক ফিলিস্তিনি। অর্থাত্, সংঘাত বন্ধের ব্যাপারে সন্দেহ ও সংশয় দূর করা যাইতেছে না। গাজা যুদ্ধ লইয়া শঙ্কা আরো বাড়িবার কারণ, এই যুদ্ধ ক্রমশ ছড়াইয়া পড়িতেছে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। অতি সম্প্রতি লেবাননে হামলা চালাইয়া হিজবুল্লাহর শীর্ষস্থানীয় এক কমান্ডারকে হত্যা করিয়াছে ইসরাইলি সৈন্যরা। স্বভাবতই এই ঘটনা আরো উত্তেজনা সৃষ্টি করিবে এতদঞ্চলে। কারণ, গত ৭ অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হইবার পর প্রায় প্রতিদিনই লেবাননের সীমান্তে হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে পালটাপালটি গোলাগুলি চলিতেছে। বিগত তিন মাসে লেবাননে হিজবুল্লাহর ১৩৫ যোদ্ধাসহ ১৮০ জনের বেশি নিহত হইয়াছেন। অপর দিকে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে দেশটির ৯ জন সেনাসদস্য এবং অন্তত চার জন বেসামরিক নাগরিকের প্রাণ ঝরিয়াছে।
গত সপ্তাহে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলের ড্রোন হামলায় হামাসের উপপ্রধান নিহত হইবার পর সংঘর্ষ আঞ্চলিক রূপ পরিগ্রহ করিবার শঙ্কা তৈরি হইয়াছে। ইসরাইল-হামাস সংঘাতে কাঁপিতেছে আরো কয়েকটি অঞ্চল। এই সকল সংবাদ বিশ্বের জন্য আদৌ শুভ নহে। গাজা যুদ্ধ অচিরেই বন্ধ করা না গেলে সংঘাত আরো মারাত্মক রূপ লাভ করিয়া সর্বাত্মক যুদ্ধ বাধিয়া যাইতে পারে, যাহা আদৌ কাম্য নহে। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ইহা একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
