‘ঘুষ ইজ গুড ফর হেল্থ’

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৫

মানুষের নানা ধরনের খিদে আছে। দেহের খিদে, পেটের খিদে, চোখের খিদে, মনের খিদে। এসব খিদে মেটানোর জন্য মানুষকে খেতে হয়। ‘খাওয়া’ শব্দটি অবশ্য কিছুটা গোলমেলে। সব ‘খাওয়া’ আবার খাওয়া নয়। যেমন মার খাওয়া শাব্দিক অর্থে খাওয়া নয়। হাওয়া খাওয়া, কিংবা ঘোল খাওয়া যাকে বলি তা-ও সত্যিকারের খাওয়া নয়; যেমন নয় ঘুষ খাওয়া। মাথা খাওয়াও ঠিক খাওয়া নয়। ধাপ্পা দেওয়া বোঝানোর জন্য ‘ঘোল খাওয়ানো’ বলা হয়। এই ঘোল পাকস্থলীতে যায় না, মগজে যায় আর মাথার রক্ত গরম করে দেয়। সত্যিকারের খাওয়া তো পেটে যাবে, রসনা তৃপ্ত করবে। দেহকে পুষ্ট অথবা নষ্ট করবে। আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রীর পাশাপাশি ঘুষও খুব জনপ্রিয় ‘খাদ্যে’ পরিণত হয়েছে। একশ্রেণির ক্ষমতাবান মানুষ এই জিনিসটি এখন দেদার খাচ্ছে। বাংলাদেশে যাদের সাধ্য আছে, তাদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হচ্ছে ঘুষ। মানুষ নানা কারণে ঘুষ খায়। অনেকে বাধ্য হয়ে খায়। এটা আবার দুই প্রকার, প্রথমত আর্থিক কারণে বাধ্য হয়ে ঘুষ খায়। তাদের যুক্তি হলো : যদি ৬০ টাকার ১ কেজি চাল ৭০ টাকায় কিনতে হয়ে, তাহলে বাকি ১০ টাকা কোথা থেকে আসবে? অনেকে আবার নাজেহাল হবার ভয়ে বাধ্য হয়ে ঘুষ খায়। তারা সাধারণত ক্ষমতাবানদের হাতে থাকেন, এবং যে কোনো সময় বিপদের আশঙ্কা করেন। এটা বদলি থেকে শুরু করে চাকরিচ্যুতি কিংবা নানা ধরনের হয়রানি—সবই হতে পারে। কেউ কেউ আছেন অতিরিক্ত লোভের কারণে ঘুষ খান। তারাই আসলে ঘুষের চক্র শুরু করেন। তাদের যুক্তি : বেতনের টাকায় পরিবার চলে না, তাই ঘুষ খেতে হয়। পরিবার চলে না কারণ সবকিছুর দাম বেশি। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে ঘুষের মূল্য যুক্ত হওয়াতে বাড়তি টাকা পরিশোধ করতে হয়।

ঘুষ কী? সাধ্যের বাইরে খরচ করার ইনকাম! নিয়মনীতি অগ্রাহ্য করে কাউকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার জন্য নগদ অথবা উপহারসামগ্রী গ্রহণ করা। আমাদের দেশে যাদের সাধ্য বা সুযোগ আছে, তারা সবাই প্রায় কমবেশি ঘুষ খায়। পরশুরামের এক গল্পে পড়েছিলাম,‘ঘুষগ্রাহী অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারে না যে সে ঘুষ নিচ্ছে।’ এখন অবশ্য দিন পালটেছে। ঘুষখোররা সজ্ঞানেই ঘুষ নেন। সাধারণত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে নিয়মনীতি ভঙ্গ করে কাউকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে যে অর্থ গ্রহণ করা হয় তা-ই হচ্ছে ঘুষ। ইদানীং নগদ টাকার পাশাপাশি নানা ধরনের উপহারসামগ্রী, সুযোগ-সুবিধাও ঘুষ হিসেবে প্রদান করা হয়।

ঘুষ সবচেয়ে বেশি উত্পন্ন হয় প্রশাসনের মগডালে। ক্রমশ সেটা আগায়, গোড়ায়, সমানভাবে বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশে ঘুষের কবল থেকে মুক্ত রাখার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’। কিন্তু এই কমিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। আর পুলিশের ঘুষ গ্রহণ তো রীতিতে পরিণত হয়েছে।

ঘুষের সঙ্গে যেহেতু অর্থ জড়িত সেহেতু এটা আসলে অর্থনৈতিক ব্যাপার। দিন যত যাচ্ছে আমাদের অর্থনীতিও ততটা বিশাল হচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে অর্থনৈতিক টানাপড়েন। সহজে চোরাপথে বড়োলোক হবার প্রবণতা। এখন সবাই বড়োলোক হতে চায়। বড়োলোক মানে মানুষ হিসেবে বড়ো নয়, টাকার হিসেবে বড়ো। পরিশ্রম করে সত্পথে রুজি করে বড়োলোক হবার মতো ধৈর্যশক্তি এখন আর কারোর মধ্যে তেমন দেখা যায় না। সবাই খোঁজে শর্টকাট রাস্তা। আর এই শর্টকাট রাস্তাটা হচ্ছে ঘুষ-দুর্নীতির চোরাপথ। এখন বড়োলোক হতে হলে দু-নম্বরি পথের কোনো বিকল্প নেই। এগিয়ে যেতে ওপরে উঠতে, ধনবান হওয়ার পথে এখন অসাধুতাই সহায়। ল্যাং মারা সম্ভব না হলে প্রয়োজন অন্য কোনো ফাঁদ। এ ফাঁদ হচ্ছে ফাইল আটকে দেওয়া। এ ফাঁদে ঘুঘু ধরা খাবেই। এদেশে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। এছাড়া রয়েছে আমলাতন্ত্র। তিন গজ জায়গা পার হতে একটি ফাইলের আঠারো হাত বদল হতে হয়। প্রতিটি হাত এক একটি বিশ্বস্ত চেকপোস্ট! মাল ছাড়ুন ফাইল নড়বে। না হলে নট নড়নচড়ন! ঘাটে ঘাটে জল ঢেলে তবেই যজ্ঞ। আমাদের বর্তমান সভ্যতা হচ্ছে কাগজ-সভ্যতা। আর কাগজ মানেই হচ্ছে ফাইল। আর ফাইল মানেই হচ্ছে ঘুষ। সুতরাং বর্তমান সভ্যতার সঙ্গে ঘুষ বাইসাইক্লিক অর্ডারে ঘুরেফিরে আসছে, আসবে। বর্তমানকালে আমরা অনেক পালটে গেছি—রূপ-জৌলুস-চাকচিক্য-ভোগ-লোভ—এসব কিছু দিয়ে এক অদ্ভুত মায়ার জগত্ আমরা তৈরি করেছি। এই অলীক রঙিন পৃথিবীর দিকে আমাদের অভিযাত্রা। উচ্চাভিলাষী মন সারাক্ষণ পেতে চায় ভোগবাদী জগতের পণ্যসামগ্রী। অথচ সাধ্যের সীমানা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। আরো আরো চাইতে চাইতে আরো আরো পেতে পেতে আর পাইয়ে দিতে সবাই মিলে অধঃপাতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।

আমাদের দেশে যারা ঘুষ খায়, তারা সহজেই একদল চৌকশ সহযোগী পেয়ে যায়। ফলে ঘুষ পেতে ঘুষ খেতে মোটেও বেগ পেতে হয় না। এ ব্যাপারে একটা গল্প বলা যেতে পারে।

মোটা টাকা ঘুষ দেওয়ার শর্তে ঠিকাদার বড়ো একটি কাজের কনট্রাক্ট পাবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানের বড়ো কর্তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেন। কর্তা সেই মোতাবেক ফাইলে লিখে দিলেন, Approved।

কিন্তু দুদিন অপেক্ষার পরও ঠিকাদার চুক্তিমতো টাকা দিতে এলো না। ঘোড়েল ঠিকাদার তাকে ঠকিয়েছে ভেবে বড়কর্তা খুব রেগে গেলেন। কিন্তু ‘বোকামি’ করে ফাইলে তো Approved লিখে ফেলেছেন, এখন উপায়!

অফিসের কেরানি বলল, কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। আমি ফাইল নিয়ে আসছি আপনি Approved শব্দটির আগে Not লিখে দিন। কর্তা তাই করলেন, হয়ে গেল Not Approved।

এর দুদিন পর হন্তদন্ত হয়ে ঠিকাদার এলেন টাকা নিয়ে। কর্তা আবারও মুশকিলে পড়ে গেলেন। Not Approved লিখে ফেলেছেন! এবার কী করবেন?

ঘাগু কেরানি এবার বলল, কোনো চিন্তা করবেন না স্যার। আমি ফাইলটি নিয়ে আসছি আবার। আপনি Not-এর পরে একটি e বসিয়ে দিন। হয়ে যাবে Note Approved অর্থাত্ অনুমোদিত হয়েছে, পদক্ষেপ নিন।

কর্তা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন আর কেরানির বুদ্ধির প্রশংসা করলেন।

এবার কর্তা খুশি, কেরানি খুশি, ঠিকাদার খুশি। সবাই হাসিখুশি।

ঘুষ-দুর্নীতি বিশ্ব জুড়ে এক মহাসমস্যার নাম। আইনের শাসন কিংবা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে এক বিরাট বাধা। দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পেতে পৃথিবীর নানা দেশে নানা রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্নীতির বিশেষায়িত তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে, কঠোর কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, দুর্নীতির দায়ে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার বিধানও রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর নানা ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। 

এ অবস্থায় করণীয় কী? ঘুষের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক-প্রশাসনিক জিহাদ ঘোষণা করা? সম্ভাব্য ঘুষখোরদের আয়-ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহের জন্য আরেকটি চৌকশ বাহিনী গঠন করা? তথ্যপ্রমাণ পেলেই জেলে চালান দেওয়া? সরিষার ভূত তাড়াবে কে? ডিআইজি মিজান আর দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক বাসির যে কাণ্ড করেছেন, তারপর এই দেশে ঘুষ-দুর্নীতি দূর হবে—এই আশা কীভাবে করব?

পুনশ্চ : অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের মুখে গল্পটা শোনা। ব্রিটিশ আমলের ঘটনা। এক তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট বিলেত থেকে ভারতবর্ষে এসেছেন বেশিদিন হয়নি। বিচারকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে একটু-আধটু বাংলা শিখেছেন। একদিন বিচারকাজ শেষে নিজ কক্ষে বসে আছেন বিচারক। হঠাত্ চাপরাশি হন্তদন্ত হয়ে তার রুমে ঢুকলেন। কোনো রকম বিরতি না দিয়েই ম্যাজিস্ট্রেটকে বললেন, ‘হুজুর, মিস্টার নাজির ইজ ইটিং ঘুষ।’ বিচারক মহাশয় বিপাকে পড়লেন। ‘ঘুষ’ শব্দের অর্থ কী জানেন না তিনি। চাপরাশিও ইংরেজি কম বোঝেন। তাই কী আর করা! এ অবস্থায় ঘুষের অর্থ বোঝাতে চাপরাশি বিচারক মহাশয়কে সরাসরি নাজিরের রুমে নিয়ে গেলেন। বিচারক নাজিরের রুমে ঢুকে দেখেন টেবিলের ওপর এক কাঁদি পাকা কলা। এই কলার কাঁদিই ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয়েছে নাজিরকে। সেখান থেকেই কলা ছিঁড়ে মুখে পুরেছেন নাজির। এ অবস্থায় তরুণ বিচারক বুঝলেন, ‘কলা’কেই মনে হয় ‘ঘুষ’ বলা হয়। কিছুদিন আগে তিনি এ ফলটি খেয়েছেনও। খুবই সুস্বাদু লেগেছে তাঁর কাছে। জেনেছেন এর পুষ্টিগুণও। তাই তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট মনে করলেন ‘কলা’র প্রতিশব্দই ‘ঘুষ’। আর সেই বোধ থেকেই বললেন, ‘ওহ্, আই থিংক সামথিং রং। বাট ইউ আর ইটিং ঘুষ। ঘুষ ইজ গুড ফর হেল্থ, এভরিবডি মাস্ট ইট ঘুষ।’

n লেখক : রম্যরচয়িতা