গণতন্ত্র পুতুলনাচের সুতা নহে

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

সত্যজিত্ রায় রচিত ও পরিচালিত বিখ্যাত ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রে হীরক রাজা তাহার জ্যোতিষীর নিকট একটি অনুষ্ঠানের শুভ দিনক্ষণ জানিতে চাহেন। জ্যোতিষী গ্রহনক্ষত্র বিচার করিয়া বলিলেন যে, রাজা যেই দিন অনুষ্ঠান করিতে চাহিতেছেন সেই দিনটি শুভ নহে। তবে ইহার পরই জ্যোতিষী যাহা বলিলেন তাহার মর্মার্থ হইল—রাজা যদি চাহেন তো, অশুভকেই শুভ বানাইয়া দেওয়া যায়; অর্থাত্ রাজার ইচ্ছাই শেষ ইচ্ছা।

সিনেমাটি রূপক। তবে এই সিনেমার বহু ঘটনা ও সংলাপের সহিত তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের নানান ঘটনার মিল খুঁজিয়া পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ পাকিস্তানের কথাই বলা যায়। দেশটি যেন সব সম্ভবের লীলাক্ষেত্র। যিনি এতদিন ছিলেন অচ্ছুত-মহাবিপদাপন্ন, অদৃশ্য মহাশক্তির অনুগ্রহে তিনিই আজ হইয়া যাইতে পারেন সবচাইতে বড় ঘুঁটি। পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)-এর প্রধান নওয়াজ শরিফ, যিনি তিন বারের প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানে ফৌজদারি মামলায় কারাদণ্ড হইলে সেই দেশের রাজনীতিকরা আর ভোটে দাঁড়াইতে পারেন না। কিন্তু সেই নিয়মই বাতিল করিয়াছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তাহার আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপর আজীবনের নিষেধাজ্ঞা গত সোমবার প্রত্যাহার করিয়াছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। স্বাভাবিকভাবেই সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে নওয়াজ শরিফের আর নির্বাচনে লড়িতে কোনো বাধা থাকিল না। অথচ, আমরা যদি নওয়াজ শরিফের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমার দিকে তাকাই, দেখিতে পাইব, প্রায় পুরাটা সময় তিনি পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সহিত বিবাদে জড়াইয়া ছিলেন। শেষবার তিনি যখন পাকিস্তানে দুর্নীতির দায়ে সাজা খাটিতেছিলেন, তখন স্বাস্থ্যগত কারণে ২০১৯ সালের নভেম্বরে জেল হইতে বাহিরে আসিবার সুযোগ পান এবং স্বেচ্ছায় লন্ডনে নির্বাসিত হন। বিবিসির একটি বিশ্লেষণে বলা হইয়াছে, অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, সেনাবাহিনী একদিন যাহাকে ক্যু করিয়া ক্ষমতাচ্যুত করিয়াছিল, বিশেষ কারণে তাহাকেই আবার ক্ষমতার মসদনে বসাইবার ব্যবস্থা করিতেছে। শুধু তাহাই নহে, গত চার বত্সরে সকল চরিত্রেরই যেন বদল ঘটিতেছে। নওয়াজ শরিফের প্রতিপক্ষ ইমরান খান, যিনি ২০১৮ সালে শরিফের জায়গায় প্রধানমন্ত্রী হন, তিনি এখন সেনাবাহিনীর সহিত প্রবল দ্বন্দ্বে কারাগারে অন্তরিন। জনাব শরিফের দল পিএমএল-এন পার্টি সেই সময় পাকিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেয়, যাহার প্রধান হইলেন নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই শাহবাজ শরিফ।

পাকিস্তানে এই বত্সর যেই নির্বাচন হইবে—তাহা কি সুষ্ঠু হইবে? এই প্রশ্ন প্রায় সকলের। ইমরান খানের দলের লোকজন বলিতেছেন যে, কীভাবে নির্বাচনের পূর্বে দেশের সবচাইতে জনপ্রিয় নেতাকে (ইমরান খানকে) কারাগারে অন্তরিন রাখিতে পারে? মজার ব্যাপার হইল, নওয়াজ শরিফের দলও অনেকটা একই কথা বলিয়াছিল, যখন ২০১৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে তিনি কারাগারে যান। সেই কারণে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়াছেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হইতেছে। শুধু এইবার পিটিআইয়ের জায়গায় সুবিধা পাইতেছে পিএমএল-এন। এই ব্যাপারে বিবিসির একটি পর্যালোচনায় বলা হইয়াছে যে, প্রথমে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী (দেশটির নেপথ্য মূলশক্তি) ইমরান খানকে বাছিয়া লইয়াছিল, কারণ তাহারা মনে করিয়াছিল, জনাব খান তাহাদের জন্য নিরাপদ। কিন্তু যখন তাহারা দেখিল ইমরান খানের দ্বারা তাহাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণত হাসিল হইতেছে না, তখন তাহারা জনাব খানকে ক্ষমতাচ্যুত করিবার সিদ্ধান্ত লইল এবং নওয়াজ শরিফকে এখন পুনরায় মঞ্চে অবতারণ করা হইল।

এই যখন হয় তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশের ভবিতব্য, তখন আড়ালে বসিয়া ‘গণতন্ত্র’ অট্টহাস্য করে বটে। ইহা যেন পুতুলনাচের ইতিকথার মতো। অদৃশ্য সুতা সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করিতেছে। সেই সুতা যাহাদের হাতে, তাহারা যাহাকে প্রয়োজনীয় মনে করেন, তাহাকে মঞ্চে লইয়া আসেন। আবার যাহাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন, মঞ্চ হইতে তাহাকে সরাইয়া নিক্ষেপ করেন অন্ধকারে। অথচ গণতন্ত্রে পুতুলনাচের অদৃশ্য সুতার থাকিবার সুযোগ নাই। তাহা হইলে আর সেইখানে গণতন্ত্র থাকে না। যাহা থাকে তাহা গণতন্ত্রের নামে পরিহাস।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন