কৃষকের পণ্ডশ্রম: বেড়েছে আবাদ কমেছে ধানের দাম

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৪, ২১:১২

গত এক দশকে ধান চাষে খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। অথচ উৎপাদন বাড়েনি, বাড়েনি ধানের বাজার দরও। বরং উচ্চমূল্য সত্ত্বেও বেড়েছে ধানের আবাদ। কাঙ্খিত দাম না পাওয়ায় বছরজুড়ে ধান ফলিয়ে কৃষকের পরিশ্রমই সার। কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী ও বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের তথ্যমতে, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া এবং জয়পুরহাট জেলায় গত এক দশকে ধানের আবাদ বেড়েছে। তবে বিঘাপ্রতি ফলন বাড়েনি। বাড়েনি ধানের দামও।

কৃষি অধিদপ্তরের বাজার সংযোগ বিভাগের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে গড়ে ধানের দাম বেড়েছে ৪৭৩ থেকে ৫৭৪ টাকা পর্যন্ত। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২৩-২৪ মওসুমে রোপা আমনের সরু জাতের ধান মণপ্রতি ১২৫১, মাঝারি ১১৩৫ এবং মোটা ধান ১০৪৮ টাকা দাম পেয়েছেন কৃষক। এ ছাড়া গত বছর মণপ্রতি ১৬৩৬, ১২৩৪ এবং ১১৩৭ টাকা করে কৃষকের ধান বিক্রির কথা বলছে বাজার সংযোগ বিভাগ।

ছবি: ইত্তেফাক

তাদের হিসেব মতে, ২১-২২ মওসুমে সরু ধান ১২০৪, মাঝারি ১০৫৯, মোটা ৯৬৮, ২০-২১ মওসুমে কৃষক ধানের দাম পেয়েছে ১২৩২ থেকে মাঝারি ১১৩৬ মোটা ১০৫১ টাকা, ১৯-২০ মওসুমে তিন জাতের ধান ৬৩৮ থেকে ৮৯৬ টাকা, ১৮-১৯ মওসুমে ৬৬৩ থেকে ৭০৩ এবং ৮২৮ টাকা, ১৭-১৮ মওসুমে ৯১৩ থেকে ১০৩৬, ১১৩৫ টাকা, ১৬-১৭ মওসুমে ৭৮২ থেকে ৮৬২ এবং ৮৯০টাকা, ১৫-১৬ মওসুমে ৫৪৯ থেকে ৬৬২ এবং ৬৭৭ টাকা, ১৪-১৫ মওসুমে মোটা ৬৭৪, মাঝারি ৭১৭ এবং সরু ধানের মণপ্রতি ৭৮২ টাকা দাম পেয়েছে কৃষক।

কৃষকের ভাষ্যমতে, বছর ঘুরলেই বাড়ে ধান চাষের খরচ। ২০১৪ সালের দিকে বিঘায় ৬ হাজার টাকা খরচে কৃষক ৬০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করেছেন। সে সময় ফলনও ভালো ছিল। এই দশ বছরে সার-কীটনাশক, বীজতলা তৈরি, শ্রমিক খরচ, জমি লীজের মূল্যসহ ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষকের খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। এখন বিঘায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে কয়েকটি জাতের ধানের ফলন ১২ থেকে ১৫ মণে নেমে এসেছে। দশ বছর আগের ৬০০ টাকা মণের ধানের দাম বেড়ে হয়েছে ৯০০ টাকা। এই মূল্যে কৃষকের প্রাপ্তি শুধু একসঙ্গে ধান ঘরে তোলা।

ছবি: ইত্তেফাক

বগুড়া আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের রেকর্ড বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে চার জেলায় রোপা আমন মওসুমে মোট ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪৮ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, উফশী এবং স্থানীয় জাতের ধান চাষ করা হয়েছিল। ওই মওসুমে ধানের উৎপাদন হয় ১৯ লাখ ৩ হাজার ৯১৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বগুড়ায় ৮ লাখ ৯৮ হাজার ৮৭৬, জয়পুরহাটে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭০১, পাবনায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ১০৬ এবং সিরাজগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়।

ছবি: ইত্তেফাক

এই চার জেলায় ২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৪০৫ হেক্টর জমিতে ধান উৎপন্ন হয় ১৮ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭২ মেট্রিক টন, ২১-২২ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮১ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে ফলন হয় ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭১৭ মেট্রিক টন, ২০-২১ অর্থবছরে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ১৮০ হেক্টরে ধান পাওয়া যায় ১৬ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ মেট্রিক টন, ১৯-২০ অর্থবছরে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৯৯ হেক্টরে ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৬১৮ হেক্টরে ১৮ লাখ ১৭৭ হাজার ২৮ মেট্রিক টন, ১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে ১৬ লাখ ৫৮ হাজার ৪২ মেট্রিক টন, ১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৩৯ হেক্টরে ১৭ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৫ মেট্টিক টন, ১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮১৮ হেক্টরে ১৭ লাখ ১৪ হাজার ৭২৭ মেট্রিক টন এবং ৩ লাখ ৬০ হাজার ১০০ হেক্টরে ধান পাওয়া যায় ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন। সবমিলিয়ে ১৫ সাল থেকে ২৪ পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের পাবনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এবং জয়পুরহাট জেলায় ২৩ হাজার ৯৪৮ হেক্টর ধানি জমি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে ধানের উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯৭০ মেট্রিকটন।

ছবি: ইত্তেফাক
 
বগুড়ার শেরপুরের কৃষক রাব্বানি, আবু রায়হান, কুদ্দুস মিয়া, গফুর আলীসহ এই অঞ্চলের অন্তত ৫০ জন কৃষক ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, এ বছর নিজের জমিতে একবিঘা ধান চাষ করতে খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। বর্গাচাষিদের ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ২০ মণের জায়গায় এবার উত্তরাঞ্চলে বিঘাপ্রতি ধানের ফলন হয়েছে ১০ থেকে ১২ মণহারে। শত প্রতিকূলা ভেঙে কৃষকের কষ্টার্জিত ধানের পাইকারি দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত।

ছবি: ইত্তেফাক

কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বোরো মওসুমে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩০৯ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাতের ধান উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৯০ হাজার ৪৫৬ মেট্রিক টন। এই চার জেলায় ১৩-১৪ অর্থ বছরে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭১ হেক্টরে ২৪ লাখ ৬৯ হাজার ৪০৬ মেট্টিক টন, ১৪-১৫ মওসুমে ৩লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৯ হেক্টরে ২৩ লাখ ৮১ হাজার ২৯৯ মেট্টিক টন, ১৫-১৬ মওসুমে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬৪৩ মেট্টিক টন, ১৬-১৭ মওসুমে ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৮ হেক্টরে ২২ লাখ ৬২ হাজার ১৮০ মেট্টিক টন, ১৭-১৮ মওসুমে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৫৮ মেট্রিক টন, ১৮-১৯ মওসুমে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৬০৩ হেক্টরে ২৩ লাখ ১৬ হাজার ৬৫৫ মেট্টিক টন, ১৯-২০ মওসুমে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৩ হেক্টরে ২২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩৪ মেট্টিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে ধান চাষ বেড়েছে ১ হাজার ৭৬২ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ১৫৭ মেট্রিক টন।

ছবি: ইত্তেফাক

রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক আনিসুর, বিল্লাল শেখ, ফজুলল মোল্লাসহ অন্তত ২০ জন কৃষক জানালেন, প্রতি বছর লাখ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করছেন তারা। কিন্তু এ পর্যন্ত ধানের কাঙ্খিত দাম পাননি। ধানের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী তাদের উৎপাদন খরচ উঠছে না। উপরন্ত বিঘায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা লোকশান গুনতে হচ্ছে। হাট-বাজারে ক্রেতা কম থাকার সুযোগে কম দামেই ফরিয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।

ছবি: ইত্তেফাক

ধানের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি

উত্তরের বেশ কয়েকটি জেলার হাটবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআর-৪৯ জাতের ধান ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, বিআর-৫১ জাত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০, শম্পা কাটারি ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ ও ৯০ জাতের ধান ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দামে ধান বিক্রি করে কৃষকরা লোকসান গুনলেও ফড়িয়ারা লাভবান হচ্ছেন। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কম দামে ধান কিনে বড় অটোমিলে বেশি দামে বিক্রি করছেন।

ছবি: ইত্তেফাক

কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সামসুল ওয়াদুদ ইত্তেফাককে বলেন, কৃষক ধান নিয়ে খুব একটা সমস্যায় নেই। তবে দেশে ধানের নতুন নতুন জাত আসছে। সেগুলোতে ফলন আরও বাড়বে। তাতে কৃষকের লোকসান হবে না।

ইত্তেফাক/পিও