ইহা কি স্রেফ দুর্ঘটনা?

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩০

নির্মাণ খাতে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হইতেছে। শ্রমিক মৃত্যুই কেবল বাড়িতেছে না, ইহা হইতে রেহাই পাইতেছে না পথচারীও। শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের হতাহতের ঘটনা লইয়া তত্ক্ষণাত্ শোরগোল উঠিয়া থাকে বটে; কিন্তু কিছুদিন যাইতে না যাইতেই বিষয়টি চাপা পড়িয়া যায় দুঃখজনকভাবে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মৌচাক উড়ালসড়ক হইতে মাথার উপর ইট পড়িয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নারী কর্মকর্তা। মগবাজারের মৌচাক মার্কেটের নিচ দিয়া হাঁটিয়া বাসায় ফিরিবার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়িয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা সকলকে ব্যথিত করিয়াছে। নির্মাণাধীন বহুতল ভবন কিংবা রাস্তাঘাটের ন্যায় অবকাঠামোর নির্মাণসামগ্রী হইতে এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়শ ঘটিয়া থাকে। ইহার জন্য অধিক দায়ী ভবন নির্মাণকারীদের উদাসীনতা ও নিয়ম না মানিবার সংস্কৃতি। এই অর্থে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিতে পারে, এই ধরনের দুর্ঘটনাকে কি ‘স্রেফ দুর্ঘটনা’ হিসাবে গণ্য করা যায়?

নির্মাণাধীন সুউচ্চ ভবন হইতে নির্মাণসামগ্রী নিচে পড়িয়া দুর্ঘটনা এবং তাহাতে হতাহতের হার সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে বাড়িয়া গিয়াছে। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, গত ১০ বত্সরে শুধু রাজধানীতেই নিহত হইয়াছেন সহস্রাধিক নির্মাণশ্রমিক। আহত হইয়া পঙ্গুত্ব বরণ করিয়াছেন অনেকে। করোনা মহামারির কারণে নির্মাণকাজ স্থবির থাকায় ২০২০ সালে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা এক শতের নিচে থাকিলেও ইহার পূর্বের এবং পরের বত্সরগুলিতে প্রাণ ঝরিয়াছে শত শত শ্রমিকের। প্রসঙ্গক্রমে বলিয়া রাখা দরকার, দেশের নির্মাণ খাতে প্রায় ৪০ লক্ষের অধিক শ্রমিক নিয়োজিত রহিয়াছেন। রাজধানীসহ দেশব্যাপী বিপুলসংখ্যক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হইতেছে; কিন্তু অধিকাংশ ভবন নির্মাণে নিয়ম-নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হইতেছে না। ভবন নির্মাণের সময় নির্মাণশ্রমিক, পথচারী এবং আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন শর্তে ছাড়পত্র দিয়া থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ; কিন্তু বাস্তবে সেই শর্তগুলো থাকে কেবল কাগজে কলমে। ফলে নির্মাণ ও নিরাপত্তাবিধি মানিতে অনীহার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এই প্রবণতা যেন স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করিয়া চলিয়াছে। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণে মোটামুটি নিয়ম মানিয়া চলিলেও আবাসিক এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে যেই সকল ভবন নির্মাণ করা হয়, সেইখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মনীতি অনুসরণের বালাই থাকে না। এই নিয়ম বা আইন না মানিবার কারণে শাস্তির বিধান নিশ্চিত করিতে না পারিলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উন্নতি হইবে না।

এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে ভবন মালিকদের সতর্ক ও সচেতন করিবার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় পথচারীদেরও সাবধানতা অবলম্বনের বিকল্প নাই। নির্মাণক্ষেত্রে শ্রমিকনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অতি জরুরি। আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, বহুতল ভবনের নির্মাণশ্রমিকরা অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করিয়া থাকেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে হেলমেটসহ জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামও ব্যবহার করেন না। অন্যদিকে, বহুতল ভবন কিংবা রাস্তাঘাট নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রী ছড়াইয়া-ছিটাইয়া রাখিতে দেখা যায়। ইহাতে শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের মানুষ ও ভবনের নিচের পথচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিয়া থাকেন। শুধু তাহাই নহে, ইহার ফলে কোনোভাবে দুর্ঘটনা ঘটিলে শ্রমিক বা পথচারী কেহই আইনি সুরক্ষা পান না সঠিকভাবে।

নির্মাণকাজে অসর্তকতার বিষয় দেখভালের মূল দায়িত্ব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। এই প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য, ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে অসতর্কতাজনিত বা নিরাপত্তা-ঘাটতিসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থাকিলেও তত্ক্ষণাত্ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নে বিভিন্ন আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে কাজ করা কঠিন হইয়া পড়ে। এই বিষয়ে জুতসই সমাধান দরকার। কারণ, উক্ত প্রতিষ্ঠান অভিযুক্তের প্রতি কয়েক দফা চিঠিপত্র প্রদান করিবার পর যখন আদালতে মামলা দেয়, তখন তাহার সুরাহায় লাগিয়া যায় দীর্ঘ সময়। দুর্ঘটনা বন্ধে এই ধরনের কালক্ষেপণ দূর করিয়া ভবন নির্মাণ আইনের সঠিক প্রয়োগ সময়ের দাবি।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন