ঢাকা শহরের ফুটপাত চলাচলের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নির্মাণাধীন ভবনের ইট, রড, কাচ, কংক্রিটের ব্লক পড়ে মৃত্যু হচ্ছে পথচারীদের। শুধু ফুটপাত কেন, পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে চলাফেরা করার সময়ও বিপদের আশঙ্কা নিয়ে হেঁটে যেতে হচ্ছে। নির্মাণাধীন ভবন থেকে সরঞ্জাম পড়ে প্রাণহানি বাড়লেও দেখার কেউ নেই। যাদের দেখভাল করার কথা, তারা নির্বিকার। মর্মন্তুদ কিছু ঘটনায় মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত বিচার পান না নিহতের স্বজনরা। অথচ আইন ও ভবন নির্মাণ বিধিমালায় পথচারীসহ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সর্বশেষ গত বুধবার সন্ধ্যায় মগবাজারে নিউ সার্কুলার রোডে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মাথায় কংক্রিটের ব্লক পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক দীপান্বিতা বিশ্বাস ওরফে দিপু সানা। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ ধারণা করছে, মগবাজার ফ্লাইওভার থেকে কংক্রিটের ব্লক খসে ফুটপাতের পথচারী দীপান্বিতার মাথায় পড়ে। পুলিশ বলছে, ফ্লাইওভার থেকে যদি কংক্রিটের ব্লক পড়ে নিহত হয়, সেক্ষেত্রের এর দায় সিটি করপোরেশনের।
ইট মাথায় পড়ে মারা যান ফুলি বেগম। ২৭ আগস্ট বাজারে যাওয়ার সময় প্রাণ হারান হনুফা বেগম। গত বছরের ২৪ এপ্রিল তুরাগের কামারপাড়ায় ইটের আস্তর পার্শ্ববর্তী টিনের চালে পড়লে সেটি ভেঙে সোহাগী আক্তারের (৭) শরীরে আঘাত লাগলে তার মৃতু হয়। ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের ৪ নম্বর সড়কে নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন থেকে ইট পড়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী রবিউল ইসলাম জিহাদ নিহত হয়।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে (বিএনবিসি) বলা আছে, নির্মাণকাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নাইলনের জাল দিয়ে পুরো ভবন ঢেকে দিতে হবে। সড়কে কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ মিটার দূরত্বে নির্মাণাধীন ভবনকে অবশ্যই ২ দশমিক ৪ মিটার বেষ্টনী দিয়ে রাখতে হবে। ভবনের চারদিকে টিন দিয়ে অস্থায়ী ছাদ বানানোর কথাও বলা আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীতে বেশির ভাগ ভবন নির্মাণ করার সময় ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মানা হয় না। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়াই একের পর এক নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। একটি ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, প্রত্যেকেই এর দায় অন্য সংস্থার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। এসব দেখভালের দায়িত্ব রাজউকের হলেও তারা বলছে, বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিআরএ) বিষয়টি দেখাশোনা করে। আবার সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এর দায় ও দেখভাল করার দায়িত্ব রাজউকের।
এ ব্যাপারে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা রয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) রয়েছে। একটি ভবন যখন নির্মাণ হয়, তখন রাজউক তার সেফটি ও সিকিউরিটির বিষয়টি দেখভাল করে। এক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা অনিয়ম হলে রাজউক সেটির ব্যবস্থা নেয়। আবার মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে, সেক্ষেত্রে মামলা দায়ের হয় এবং আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে পুলিশ। আবার মগবাজারে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটির বিষয়ে পুলিশ বলছে যে, ফ্লাইওভার থেকে কংক্রিটের ব্লক পড়ে নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে ফুটপাত বা সড়ক নিরাপদ করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এটির সঙ্গে রাজউকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী কতটুকু নিরাপত্তা বেষ্টনী দিতে হবে, তা বিধিমালা ও বিল্ডিং কোডে স্পষ্ট করা আছে। কিন্তু বেশির ভাগ ভবন মালিক ও নির্মাণকারী সংস্থা সেগুলো মানেন না। অনেক সময় অর্থ বাঁচাতে অদক্ষ শ্রমিক ব্যবহার ও অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটছে। এগুলো দেখভালের জন্য সরকারের যে দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারাও উদাসীন। এ অবস্থার উন্নতি চাইলে নির্মাণকারী ও সরকারি তদারকি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ দরকার। সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
