নির্বাচনোত্তর ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর সহিংসতা

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

আমাদের দেশে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ও পরে যত সহিংসতা হইয়া থাকে, তাহার অন্যতম শিকার হন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীগণ। বিশেষত হিন্দুদের নিকট ইহা যেন ললাটের লিখন। তাহা ছাড়া রামু, উখিয়া ইত্যাদি উপজেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপরও আমরা নৃশংস সহিংসতা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। একুশ শতকে আসিয়া ইহা ইতিহাস হইয়া যাইবার কথা ছিল; কিন্তু অবস্থার তেমন একটা পরিবর্তন হয় নাই। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন হওয়া উচিত উত্সবমুখর; কিন্তু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিকট ইহা এক আতঙ্কের নাম। একেকটি জাতীয় নির্বাচন আসে, আর তাহার ফল যাহাই হউক, তাহাদের উপর নির্যাতন ও হামলার ঘটনা ঘটেই। কারণ তাহাদের নিকট নির্বাচন যতটা ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা বা গণতন্ত্র সুসংহত করিবার ব্যাপার, তাহার চাইতে অধিক নিজেদের বিপন্ন দেখিতে পাইবার উপলক্ষ্য মাত্র। নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় তাহাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, অপহরণ, লুটপাট, খুনখারাবি, নারী লাঞ্ছনা ইত্যাদি যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। একশ্রেণির লোভাতুর, ক্ষমতাপিপাসু ও পাষণ্ড মানুষের কারণে এই দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি আজও প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।

এইবারের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আতঙ্কিত ছিলেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা নির্বাচনোত্তর সহিংসতার আশঙ্কা ব্যক্ত করে। যদিও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায় নাই, তথাপি প্রতিদিন যেই সকল খবর পাওয়া যাইতেছে, তাহাতে আমরা উদ্বিগ্ন। ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত এক খবরে বলা হইয়াছে যে, নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের উপর হামলা-নির্যাতন বৃদ্ধি পাইয়াছে। বিশেষ করিয়া পিরোজপুর-২ আসনভুক্ত স্বরূপাকাঠী  (নেছারাবাদ) ও পিরোজপুর-১ আসনের নাজিরপুর উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দাদের উপর হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ায় পিটাইয়া আহত করা, হাত-পা ভাঙিয়া দেওয়া, তাহাদের বাড়ি বা দোকানে অগ্নিসংযোগ করা বা তালা মারিয়া বন্ধ করিয়া দেওয়া ইত্যাদি সহিংস ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। এই সকল এলাকায় সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের উপকারভোগীদের ভাতা কাটিয়া নেওয়ারও হুমকি দেওয়া হইতেছে। এই ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় স্বাভাবিক কারণেই সর্বত্র আতঙ্ক ছড়াইয়া পড়িয়াছে। সরকারি দলের একজন স্থানীয় নেতা অ্যাডভোকেট কানাই লাল বিশ্বাসও এই ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন। এমনকি ইতিমধ্যে নির্বাচন-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাইয়াছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ।

ইহার পূর্বে আমাদের পক্ষ হইতেও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের জানমাল রক্ষায় সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হইয়াছে; কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি রাজনীতিকীকরণের নেতিবাচক প্রভাব যেমন নির্বাচনের পূর্বে ও নির্বাচনের সময় দেখা গিয়াছে, তেমনি নির্বাচনের পরেও অতি উত্সাহীরা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করিতেছেন বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। ইহাতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা। বর্তমানে এমন কোনো পেশা নাই, যেইখানে রাজনীতিকরণের ছাপ পড়ে নাই। যাহারা বিভিন্ন পেশায় কর্মরত, তাহাদের অনেক সময় রাজনীতির সহিত সম্পৃক্ততা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। তবে ইহা দেশের জন্য বিপজ্জনক এবং ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেতস্বরূপ।

স্বাভাবিক রাজনীতির দাবি হইল, প্রশাসনকে অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকিতে হইবে। এই নিরপেক্ষতা অবলম্বন ব্যতীত স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালন করিতে পারে না। যদিও স্বীকার করিতে হইবে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাহারা দায়িত্বে রহিয়াছেন, তাহারা দায়িত্ব যথাসম্ভব পালন করিবার চেষ্টা করিতেছেন; কিন্তু এই প্রশাসনকে যে কোনো দিক দিয়া কে নিয়ন্ত্রণ করিতেছেন, তাহা বোঝা কঠিন। এই জন্য তাহারা অনেক সময় অসহায়, হতবিহ্বল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়েন। তবে এইভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা ও নির্যাতন অব্যাহত থাকা দেশের জন্য অমঙ্গলজনক। কেননা, এইখানে সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাহাদের উপর হামলার বিষয়টি আগুন লইয়া খেলিবার নামান্তর। আর যাহারাই এই আগুন লইয়া খেলিতে যাইবেন, তাহাদের হস্তই শুধু পুড়িবে না, শরীরও পুড়িয়া ভস্ম হইতে পারে। তাই এমন হামলা ও নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি যাহাতে না ঘটে, সেই ব্যাপারে আমরা নূতন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন