‘এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে মন নাহি চায়’—এই জনপ্রিয় গানটি লিখিয়াছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আর অসম্ভব দরদি কণ্ঠে গাহিয়াছিলেন শ্যামল মিত্র। এই গানের মধ্যে পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য আস্বাদন করিবার এক অপার ব্যাকুলতা ফুটিয়া উঠিয়াছে। একটু ভাবিয়া দেখিলে বুঝা যায়, পৃথিবীর সকল বিচক্ষণ মানুষের মধ্যেই এই আকুলতা রহিয়াছে। ঐ গানটির লেখক ও গায়ক—কেহই এই পৃথিবীতে আজ নাই। এখন আমরা যাহারা আছি, তাহারাও একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করিব। এই বিবেচনায় বিদ্বজ্জনেরা মনে করেন, যাহার আয়ু অধিক তিনিই তত অধিক এই পৃথিবীর রূপ-রস উপভোগ করিতে পারিবেন। অপর দিকে যাহার যত আয়ু অধিক অবশিষ্ট রহিয়াছে, তিনিই তত অধিক ধনী। এখন এক জন অল্পবয়সি মানুষের আয়ু অধিক অবশিষ্ট রহিয়াছে, ইহা ভাবিবার কোনো কারণ নাই। প্রকৃতপক্ষে, তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করিলে একজন মানুষ অনেক অধিক আয়ুষ্মান হইয়া থাকে। আর এই স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস। প্রকৃত অর্থে, খাবার হইল শরীরের জ্বালানি। সেই জ্বালানিতে যদি সমস্যা থাকে, তাহা হইলে মানুষের শরীর নামক ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিবেই।
জরিপে দেখা গিয়াছে, দক্ষিণ এশিয়ার স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে করোনারি হূদেরাগের কারণে তিন-চতুর্থাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটিয়া থাকে। ইতিপূর্বে প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে বলা হইয়াছে, তরুণ ও মধ্যবয়স্কদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের হার প্রতি বত্সরে ২ শতাংশ করিয়া বাড়িতেছে। চিকিত্সকদের মতে, অন্যান্য বেশ কিছু কারণসহ অস্বাস্থ্যকর খাবার, বিশেষ করিয়া ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা দিনদিন বাড়াইয়া তুলিতেছে। খাবারের ট্রান্সফ্যাট হইল এক কথায় ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় খাবার। ইহা রক্তের ‘ভালো’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাইয়া দেয় এবং ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াইয়া দেয়। গত সোমবার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বোতলজাত সয়াবিনে ক্ষতিকর ‘ট্রান্সফ্যাট’ রহিয়াছে। ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিডের এই উপস্থিতি উঠিয়া আসিয়াছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্র্যান্ট পাবলিক হেলথ স্কুলের ১৩ জন গবেষকের দুই বত্সর মেয়াদি এক গবেষণায়। ইহাতে বাজারের বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় সহনীয় মাত্রার চাইতে অধিক ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া গিয়াছে। খোলা সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে হারটি প্রায় ২৫ শতাংশ। ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড ‘ট্রান্সফ্যাট’ নামে বহুল প্রচলিত। গবেষকরা মনে করিতেছেন, সয়াবিন তেলে ট্রান্সফ্যাট তৈরি হইতে পারে পরিশোধন প্রক্রিয়ার কোনো গলদে। অতীতের গবেষণার বরাত দিয়া এই গবেষণায় বলা হইয়াছে, ভোজ্য তেল পরিশোধন করা হয় উচ্চ তাপে, তখনই ট্রান্সফ্যাট বৃদ্ধি পায়। ট্রান্সফ্যাট (টিএফএ) রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে এবং ভালো কোলেস্টেরল কমাইয়া দেয়। ফলে হূদ্যন্ত্রে মাত্রাতিরিক্ত খারাপ কোলেস্টেরলের কারণে হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্কের স্ট্রোক, রক্তনালির অসুখ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়া যায় বহুগুণ। ইতিপূর্বে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্সফ্যাট নির্মূলের লক্ষ্য ঠিক করিয়াছিল। সংস্থাটি বলিয়াছে, সকল ফ্যাট, তেল ও খাবারে প্রতি এক শত গ্রাম ফ্যাটে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই গ্রামে সীমিত করিতে হইবে।
ইতিপূর্বে বাংলাদেশে প্রণয়ন করা হইয়াছে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১। এই প্রবিধানমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ায় ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর সব তেল, ফ্যাট ও খাদ্যপণ্যে শিল্পোত্পাদিত ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের দুই শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখিবার নিয়ম জারি হইয়াছে; অর্থাত্ এখন মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট ব্যবহার হইবে দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা আশা করিব দ্রুত ট্রান্সফ্যাটের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহল যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। একই সঙ্গে তরুণ জনগোষ্ঠীকেও সচেতন হইতে হইবে, তাহারা যেন হূদেরাগের ঝুঁকি এড়াইতে খাদ্যাভ্যাসে সঠিক পরিবর্তন আনিয়া ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার পরিহার করেন।
