কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে ডিপিপি নেতাকর্মীরা নেলসন ম্যান্ডেলার আত্মজীবনী পড়ে মনোবল চাঙ্গা রাখতেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চালিয়ে যেতেন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন এই স্বপ্নে যে, সুসময় একদিন আসবেই। ডিপিপির সুদিন এসেছে অনেক আগেই। এখন শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা
১৩ জানুয়ারি। চমত্কার, রৌদ্রোজ্জ্বল শনিবার। এ দিন তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ১ কোটি ৪০ লাখ নাগরিক অংশ নেন ভোটাভুটিতে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ ভোটারের মধ্যে আমার বৃদ্ধ বাবা-মাও ছিলেন। অন্য সবার মতোই নির্বাচন নিয়ে বাড়তি কৌতূহল ছিল আমাদের মধ্যে। কারণ, রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নে তাইওয়ানের হাজার হাজার পরিবারের মতো বিভক্ত সমাজে বসবাস আমার পরিবারেরও। সত্যি বলতে, এবারের নির্বাচন ঘিরে একটু বাড়তি উত্তেজনাই বিরাজ করছিল সবার মনে। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে রীতিমতো কাঁপছিলাম আমরা। তবে ভোটের দিন একদম শান্তশিষ্ট থাকতে চেষ্টা করেছি।
ভোটের দিন একটি ছবি তুলে আমি সাড়ম্বরে ঘোষণা করেছিলাম, ‘প্রিয় জন্মভূমি, তোমাকে নিয়ে আমি গর্বিত’। এই কথার মধ্য দিয়ে আমি কী বোঝাতে চেয়েছি, তা কেবল আমিই জানি। গর্ব করে বলতে হয়, এমন একটি গণতন্ত্রান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছে আমার দেশ, যার প্রশংসা না করলেই নয়।
নির্বাচনের দিন ভোট প্রদান শেষে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মিলিত হই পরিবারের সবাই। দুপুরের খাবার খাই। মুরগির মাংস ছিল খাবারের টেবিলে। খাবার শেষে আইসক্রিমে মজে ছিলাম। এসব অবান্তর কথা কেন বলছি? বলছি এই কারণে যে, গল্পের ঘটনাপ্রবাহ ধরে সুখানুভূতিতে ভেসে চলেছে আমাদের মন। অধিকাংশ তাইওয়ানিজের অনুভূতি জুড়েও আশা করি এরকমটাই ঘটছে। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এমন সব পোস্ট ভেসে বেড়াচ্ছে, যা দেখে বেশ ভালোমতোই বুঝতে পারছি, প্রজন্মের স্রোতে অবগাহন করা তাইওয়ানিজরা কতটা খোশমেজাজে রয়েছেন।
বিশ্ব এখন জেনে গেছে, তাইওয়ানের নির্বাচনে টানা তৃতীয় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক প্রগ্র্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি)। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা! ১৯৯৬ সালে যখন তাইওয়ানে প্রথম বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন কেউ কি ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পেরেছিল যে, সেই সময়কার ‘নাশকতাকারী ও নিম্নবিত্তদের দল’ এভাবে টানা মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে। কেউ কি ভেবেছিল, এমন একটা দিন আসবে, যখন দেশের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে ডিপিপি।
ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা হচ্ছে ডিপিপির অবিস্মরণীয় সাফল্যগাথা। এ দলের সদস্যরা একসময় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। তাদের হাত ধরেই ১৯৮৬ সালে সামরিক আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠা পায় ডিপিপি। রাতারাতি এই সংগঠন গড়ে উঠেছে, এমন কথা কি কেউ বলতে পারবেন? বরং বহু ত্যাগ-তীতিক্ষা স্বীকার করতে হয়েছে ডিপিপিকে আজকের অবস্থানে আসার জন্য। রাষ্ট্রদ্রোহের তকমা গায়ে মাখতে হয়েছে। বিদ্রোহ করার অভিযোগে গ্র্রেফতার হয়ে জেল খাটতে হয়েছে নেতাকর্মীকে। এত কিছু করেও আটকানো যায়নি ডিপিপিকে। বরং কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে ডিপিপি নেতাকর্মীরা নেলসন ম্যান্ডেলার আত্মজীবনী পড়ে মনোবল চাঙ্গা রাখতেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চালিয়ে যেতেন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন এই স্বপ্নে যে, সুসময় একদিন আসবেই। ডিপিপির সুদিন এসেছে অনেক আগেই। এখন শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা।
ডিপিপির যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না মোটেই। ১৯৮৭ সালে তাইওয়ান সামরিক আইনের অবসান ঘটলে জেল থেকে ছাড়া পান ডিপিপি নেতা-সমর্থকরা। এরপর সরকারে আসার কাজে হাত লাগান। চষে বেড়ান গোটা তাইওয়ান। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাদের। একটা সময়ে এসে পান কাঙ্ক্ষিত জয়ের দেখা। তাইওয়ানের সেই সংগ্রামী গল্পের সাক্ষী তাবত্ দুনিয়া। বহু হূদয়বিদারক ঘটনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা ডিপিপির এই অগ্রযাত্রাকে অবিসংবাদিত, আশাব্যঞ্জক হিসেবে অবিহিতি না করলেই নয়।
জেনে রাখা প্রয়োজন, তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন দেশটির ক্ষমতাসীন ডিপিপি প্রার্থী লাই চিং-তে। বিজয়ী প্রার্থী লাই তাইওয়ানের সর্বশেষ সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। লাইকে অত্যন্ত অপছন্দ করার কথা বেইজিং প্রকাশ্যেই বলে আসছে। এমনকি তাইওয়ানের স্বাধীনতার সপক্ষে শক্ত অবস্থান ধরে রাখা ডিপিপি মনোনীত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী লাইকে প্রত্যাখ্যানের জন্য ভোটারদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ দিয়ে আসছিল চীন। তবে তাইওয়ানের ভোটাররা বেইজিংয়ের চাপ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে ডিপিপিকে তৃতীয় দফায় জয়ী করে ক্ষমতার চেয়ারে বসিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে বিশেষ করে বিগত আট বছর ধরে স্বশাসিত তাইওয়ানের প্রতি চীনের হুমকি আগামী দিনগুলোতে আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউজের জরিপে উঠে এসেছে, তাইওয়ান বিশ্বের ষষ্ঠ ‘মুক্ত দেশ’। এক্ষেত্রে ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও তাইওয়ানের পেছনের সারিতে অবস্থান করছে। এশিয়া জুড়ে এক বিচিত্র লোকালয় গড়ে তুলেছে ‘আজকের তাইয়ান’। এটি এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে প্রকৃত অর্থেই বিচিত্র ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশার লোকের বসবাস। তাইওয়ানের আইনসভায় মহিলাদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। বিষয়টি গর্বেরও বটে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সাশ্রয়ী মূল্যে গণপরিবহনের সহজপ্রাপ্যতা দেশবাসীর মনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। সত্যি বলতে, তাইপে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে চলেছে, যা প্রকৃতপক্ষে বহুসংস্কৃতি ও বহুভাষী জনগোষ্ঠীর ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত।
বর্তমান বাস্তবতা এটাই, তাইওয়ান বা ডিপিপির এই এগিয়ে চলা বেইজিংয়ের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, নির্বাচনে জয় লাভের মধ্য দিয়ে ডিপিপি আবারও প্রমাণ করে দেখাল, তাইওয়ানে গণতন্ত্র কাজ করছে বহাল তবিয়তে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে গণতন্ত্র যেখানে বড্ড বেমানান, সেখানে তাইওয়ানের অস্তিত্ব জুড়ে গণতন্ত্রের জয়োধ্বনি—বিষয়টি বেইজিংয়ের গলায় শক্ত কাঁটা হয়ে বিঁধছে বটে!
নির্বাচনি ফলাফল বিবেচনায় ডিপিপি একটি দুর্দান্ত জয় পেয়েছে বলতে হবে। পরাজিত দুই দল কুওমিনতাং (কেএমটি) ও তাইওয়ান পিপলস পার্টি (টিপিপি) জোট বেঁধে চললে ডিপিপির কাজ কঠিন হতে পারত। যদিও সেরকমটা হয়নি। তবে ডিপিপি যেহেতু আইনসভায় কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেক্ষেত্রে বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লাইকে। আগামী চার বছর লাইয়ের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং নিঃসন্দেহে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচন থেকে ডিপিপিকে শিক্ষা নিতে হবে। কারণ, বিগত আট বছরে দলটির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, তরুণদের সেভাবে আকৃষ্ট করতে না পারা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম বেতন, আবাসন ব্যয়সংক্রান্ত জটিলতা, নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে দুর্বলতা, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত ব্যবধান প্রভৃতি বিষয়ে উত্তরণের ক্ষেত্রে কাজ করার কথাও ভাবতে হবে নতুন সরকারকে।
নব-নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন মনে করলে নতুন করে ইতিহাস ঝালিয়ে নিতে পারেন। তাইওয়ানের সংগ্রামী ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বোলানো যাক। ১৯৮৭ সাল থেকে কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে আসছে তাইওয়ানের মুক্তিকামী জনগোষ্ঠী। এ ধারাবাহিকতায় চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকের গোড়ার দিকে পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিনতর হতে শুরু করে। দেশটির গ্রামীণ জনপদের কোল ঘেঁষে আবাদী জমিতে পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। দেশের দরিদ্র কৃষক, জেলে ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি তা হতে দেননি। প্রতিবাদ মিছিল, আন্দোলন করে রুখে দিয়েছিলেন ঐ অপতত্পরতা।
২০১২ সালে আদিবাসী জনগণ ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা টানা ১৭ দিন খালি পায়ে হেঁটেছিলেন। এটা ছিল একধরনের প্রতিবাদ। তাদের বসবাসের উপকূল ঘেঁষে একটি মেগা হোটেল নির্মাণ ঠেকাতেই এমন সিদ্ধান্ত বেছে নিয়েছিলেন তারা। শেষ পর্যন্ত তারা সফল হন।
ঐ ঘটনার পাঁচ বছর পর আদিবাসীদের জমি থেকে অযাচিতভাবে খনিজসম্পদ আহরণের প্রতিবাদ জানিয়েছিল জনগণ। এ আন্দোলনেও তারা সফল হন। পরের ঘটনা ২০১৪ সালের। চীনের সঙ্গে একটি গোপন বাণিজ্যচুক্তির প্রতিবাদে পথে নামে কলেজছাত্ররা। শুরু করে তীব্র আন্দোলন। তাদের দাবির সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে ৫০ লাখের বেশি তাইওয়ানিজ। কঠোর আন্দোলনের মুখে বন্ধ হয়ে যায় বাণিজ্যচুক্তি।
এসব আন্দোলন, সংগ্রাম থেকে প্রেসিডেন্ট লাই শিক্ষা নিতে পারেন। নিতে পারেন সাহস, শক্তি। ডিপিপিকেও ধরে রাখতে হবে শক্ত অবস্থান। ডিপিপির আসল ও একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত, ‘নিজেকে উত্তরোত্তর ছাড়িয়ে যাওয়া’।
বিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নতুন প্রেসিডেন্টের উচিত, তরুণদের মন জয় করার দিকে মনোনিবেশ করা। বিরোধীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাওয়া কঠিন বটে। তবে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে দেশকে স্বাভাবিক রাখার প্রশ্নে এটাই ভালো সিদ্ধান্ত হবে। কেননা, চীনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা বেশ কঠিনই!
লেখক: ন্যাশনাল চেংচি ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অব ইনোভেশনের ভিজিটিং অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। তাইওয়ান-ভিত্তিক নিউজলেটার ব্রড অ্যান্ড অ্যাম্পল রোডের নিয়মিত লেখক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: সুমৃত খান সুজন
