হানাহানিই কি বিশ্বের নিয়তি?

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০

সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদে বসবাস করিবার সুবিধার্থে মানবজাতির জন্য ধূলিবিশ্ব গড়িয়া দিয়াছেন মহান সৃষ্টিকর্তা; কিন্তু সেই বিশ্বের বুক চিরিয়া শতসহস্র সীমানাপ্রাচীর তুলিয়াছে রাজনৈতিক জীব হিসাবে অবিহিত মানুষ। ইহার ফলে অনেকটা অবচেতন মনেই সৃষ্টি হইয়াছে ‘বিভেদের গণ্ডি’। বিভেদপূর্ণ এই সমাজব্যবস্থা যেন সর্বদাই বিবাদপূর্ণ, হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক। বিশেষ করিয়া ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বশবর্তী হইয়া বিবদমান রাষ্ট্রগুলি যখন প্রতিহিংসাপরায়ণ ও সহিংস রূপ পরিগ্রহ করে, তখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি হইয়া উঠে সর্বগ্রাসী। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সর্বত্রই কেবল দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের ঘটনঘটাই শুনিতে পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র কিংবা শক্তি একের পর এক যেইভাবে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও সহিংসতা ঘটাইয়া চলিয়াছে, তাহাতে উপর্যুক্ত বক্তব্যের মর্মার্থ উপলব্ধি কঠিন নহে।

আমরা লক্ষ করিতেছি, চলমান ইউক্রেন এবং গাজা যুদ্ধের মধ্যেই উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছে বিশ্বের আরো কিছু অঞ্চল। গত মঙ্গলবার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে হামলা চালাইয়াছে ইরান, যাহাতে দুই শিশুর মৃত্যু হইয়াছে বলিয়া দাবি করিয়াছে ইসলামাবাদ। তেহরানের ভাষ্য, জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ আল আদলের দুইটি ঘাঁটি লক্ষ্য করিয়া হামলা চালিইয়াছিল তাহারা। এই হামলার ঘটনাকে ‘বেআইনি কর্মকাণ্ড’ উল্লেখ করিয়া ইসলামাবাদ বলিয়াছে, ‘পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের উপর এই আঘাত সংকটজনক ফল ডাকিয়া আনিতে পারে, যাহার দায় ইরানকেই লইতে হইবে।’ উল্লেখ্য, পাকিস্তানে হামলার এক দিন পূর্বে ইরাকে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার দপ্তর ও সিরিয়ায় আইএসের ঘাঁটি লক্ষ্য করিয়া হামলা চালায় ইরান। অর্থাত্, পরপর তিনটি দেশে তেহরানের হামলার মধ্য দিয়া এই অঞ্চলে নূতন সংকটের ঘণ্টাধ্বনি বাজিল! উপরন্তু, পাকিস্তানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এই নজিরবিহীন ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়া দেখিবার অবকাশ রহিয়াছে। কারণ, দেশ দুইটির মধ্যবর্তী প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমানার নিরাপত্তা দীর্ঘদিন ধরিয়া উদ্বেগ ছড়াইতেছে। গত মাসে এই সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় একটি হামলার ঘটনায় এক ডজনের অধিক ইরানি পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। ঐ ঘটনার জন্য জঙ্গীগোষ্ঠী জইশ আল আদলকে দায়ী করিয়া তেহরান জানাইয়াছিল, হামলায় অভিযুক্ত জঙ্গিরা পাকিস্তান হইতে ইরানে প্রবেশ করিয়া হামলা চালাইয়াছে। আড়ালের ঘটনা যাহাই হউক না কেন, এইরূপভাবে হামলা-পালটা হামলার মধ্য দিয়া নূতন যুদ্ধ ও সংকট দেখা দিলে অবাক হইবার কিছুই থাকিবে না।

গভীর উদ্বেগের সহিত লক্ষণীয়, যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের সহিত কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার ন্যায় পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় অতি সম্প্রতি হুথিদের উপর যৌথ বিমান হামলা চালানো হইয়াছে। এই পক্ষের দাবি, লোহিতসাগরে চলাচলকারী জাহাজে হুথিরা ধারাবাহিতভাবে হামলা চালাইয়া আসিতেছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলিয়াছেন, ‘হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা না লইয়া ব্রিটেনের উপায় ছিল না।’ একই ধরনের কথা বলিতেছেন হুতি নেতারাও। তাহাদের বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাইতে এবং গাজা যুদ্ধ আরো ছড়াইয়া পড়া ঠেকাইতেই বাণিজ্যিক জাহাজগুলিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করিতে বাধ্য হইতেছে তাহারা। হুতিদের এই ধরনের দাবি অবশ্য প্রশ্নের মুখে পড়িয়াছে। কারণ, হুতিরা আরব-বিশ্বে বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করিতেছে বলিয়া জনশ্রুতি রহিয়াছে। এই পটভূমিতে পশ্চিমা হামলার শিকার হুতিরা যে নূতন করিয়া হামলা চালাইবে না, এমন গ্যারান্টি কেহ দিতে পারিবে না।

এই যে হামলা, সহিংসতা ও যুদ্ধবিগ্রহ—ইহার ফলে বিশ্বের যে কী পরিমাণ অপূরণীয় ক্ষতি হইতেছে, তাহা কি পক্ষগুলি একটুও ভাবিতেছে? সুয়েজখালের কথাই যদি ধরা হয়, এই খাল দিয়া প্রতিদিন গড়ে ৬৮টি জাহাজ চলাচল করে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক পণ্যের ১২ শতাংশ পরিবহন হয় এই পথ দিয়া। এই অবস্থায় লোহিতসাগরে হুতি-বিদ্রোহীদের উপর হামলা-পালটা হামলার ফলে বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা কোন পর্যায়ে উপনীত হইবে, তাহা কি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনুধাবনের বাহিরে রাখিতে পারিবে? এই বত্সর এমনতিই বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নির্বাচনের তথা ‘অস্থিরতার বত্সর’। তাহার মধ্যে আবার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও যুদ্ধাবস্থা চলিতেছে। এমন একটি সময়ে বিশ্বশক্তিগুলির হানাহানিতে জড়াইয়া পড়িবার ফল মারাত্মক হইতে পারে। সংঘাত, হানাহানি ও হিংসার আগুনে অগ্নিদগ্ধ বিশ্বের ভবিষ্যত্ কী হইতে পারে, তাহাই চিন্তার বিষয়।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন