প্রথমবারের মতো সড়কে মৃত্যুর বার্ষিক হিসাব প্রকাশ করিয়াছে সরকারি সংস্থা বিআরটিএ। তাহাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বত্সর দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে ৫ হাজার ৪৯৫টি। এই সকল দুর্ঘটনায় মারা গিয়াছেন ৫ হাজার ২৪ জন। আহত হইয়াছেন ৭ হাজার ৪৯৫ জন। বিআরটিএর মৃত্যুর পরিসংখ্যান হইতে বলা যায়, প্রতিদিন গড়ে মৃত্যু হইতেছে ১৪ জনের।
শরীরের জ্বর যেমন কোনো রোগ নহে, কোনো রোগের উপসর্গ—তেমনি সড়কে এত মৃত্যুর বিষয়টি আরো বৃহত্তর সমস্যার উপসর্গ বলা যায়। আর তাহা হইল মানব উন্নয়ন সমস্যার উপসর্গ। স্বাধীনতা অর্জন-পরবর্তী এই অর্ধশত বত্সরে দেশের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে আমরা নিঃসন্দেহে যথেষ্ট পথ পাড়ি দিয়াছি। বলা যায়, অবকাঠামো উন্নয়নের সোপানে আমরা দ্রুতই উপরের দিকে উঠিতেছি। প্রশ্ন হইল—অবকাঠামোগত উন্নয়নে আমরা যত দূর অগ্রসর হইয়াছি, মানব উন্নয়নে ততখানি অগ্রসর হইতে পারিয়াছি কি? ১৭ কোটি মানুষের জন্য ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল খুব অধিক জায়গা নহে। তাহার উপর এই মানুষের একটি বড় অংশ দরিদ্র, অশিক্ষিত ও পিছিয়ে পড়া। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। এই ক্ষেত্রে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলিতে হয়, আমাদের এত শত অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রকৃত সুফল আমরা পাইব না, যদি আমাদের মানব উন্নয়ন ঠিকমতো না হয়। মানুষের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষা না থাকিলে, সচেতনতা কম থাকিলে মানুষ জীবনের ঝুঁকি লইয়া ট্রাফিক নিয়মকানুন না জানিয়া কিংবা না মানিয়া রাস্তা পার হইবেই। অথচ পশ্চিমা উন্নত দেশে ছোটবেলা হইতেই সাধারণভাবে শিখানো হয় কীভাবে রাস্তায় চলাফিরা করিতে হয়।
আমাদের প্রচুর রাস্তা তৈরি হইতেছে ঠিকই; কিন্তু রোড ইঞ্জিয়ারিং কি ঠিকমতো অনুসরণ করা হইতেছে? দেখা যায়, ফ্লাইওভার এমন জায়গায় তৈরি করা হইয়াছে, যেইখান দিয়া সড়কে নামা ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তায় যত অধিক বাঁক তত অধিক ঝুঁকি। রাস্তা তৈরির দায়িত্বে থাকেন উচ্চশিক্ষিত প্রকৌশলীরা; কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাস্তা নির্মাণের সাবকন্ট্রাক্ট লইয়াছেন অন্য কেহ—যাহারা যথাযথভাবে রাস্তা নির্মাণের ব্যাপারে অভিজ্ঞ বা দায়িত্বশীল নহেন। তাহাদের মনোযোগ কেবল লাভের দিকে। ফলে কাজটি শেষ করে দায়সারাভাবে। এখন কথা হইল, কাজটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ও সময়মতো শেষ করা হইল কি না—তাহা দেখভাল করিবার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রহিয়াছেন। প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজের কর্মকর্তারা রহিয়াছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত অফিসার রহিয়াছেন। এসও, এসডি, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার—এত স্তরের কর্মকর্তারা কী করিয়াছেন? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাহাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিলে কোনো একটি উন্নয়নকাজও নির্দিষ্ট নিয়মের বাহিরে হইবার সুযোগ নাই। কারণ নির্মাণকাজের সকল উপকরণের মানের ও আকারের স্পেসিপিকেশন রহিয়াছে—তাহা বিটুমিন হউক কিংবা ইট, বালু সুরকি— যাহাই হউক না কেন! নির্দিষ্ট মানের বাহিরে নিম্নমানের উপকরণ দিয়া নির্মাণকাজ করিবার সুযোগ নাই। সুতরাং কাজটি ক্রয়বিক্রয় হইলেও স্পেসিপিকেশন অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তারা বুঝিয়া লইবেন—ইহাই তাহাদের দায়িত্ব; কিন্তু তাহারা কি এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়া থাকেন? এই দায়িত্ব পালন করিলে কয়েক দিন পরই কেমন করিয়া নূতন নির্মিত রাস্তার আস্তরণ উঠিয়া যাইবে? এখন সিমেন্টের ঢালাইয়ের টিকসই রাস্তা নির্মাণের নজির দেখা যাইতেছে। ইহা যতখানি টিকসই হইবার কথা, তাহা হইতেছে না। কেন?
এত ধরনের সমস্যা অনিয়ম অরাজকতা একটি দেশে তখনই চলিতে পারে যখন সেই দেশের মানব উন্নয়ন কম হয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম থাকে। সুতরাং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপশি মানুষের উন্নয়ন করিতে হইবে। রাষ্ট্র দায়িত্ব লইয়া যদি মানুষের উন্নয়ন না করে তাহা হইলে উন্নত দেশের পর্যায়ে যাইতে আমাদের আরো শত বত্সর লাগিবে। অন্যদিকে মানুষের উন্নয়ন সাধন করা হইলে আমরা কয়েক দশকেই উন্নতির কাতারে চলিয়া যাইব। সুতরাং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকৃত সুফল পাইতে আমাদের মানব উন্নয়নের উপর সমহারে জোর দিতে হইবে।
