আস্থাহীনতাই উন্নয়নশীল বিশ্বের নিয়তি

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:৩০

আস্থা খুবই অদ্ভুত বিষয়। একবার ভাঙিয়া গেলে তাহা আর কখনোই তৈরি হইতে পারে না কিংবা তৈরি হইতে লাগিয়া যায় সুদীর্ঘ কাল। এইরূপভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতি অগ্রসর হয় একধরনের আস্থা-অনাস্থার দোলাচলের মধ্য দিয়া। আর এই অনাস্থার চূড়ান্ত রূপ পরিলক্ষিত হয় বিশেষ করিয়া নির্বাচনের সময়। জাতীয় নির্বাচনই কেবল নহে, স্থানীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনেও এই প্রবণতা বিরাজমান। এহেন অনাস্থার কারণ, এই সকল জনপদকে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই গ্রাস করিতেছে ‘হযবরল অবস্থা’। কি নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী বা পুলিশ-প্রশাসন, কি দলীয় নেতাকর্মী, অর্থের নিকট বিবেক বিকাইয়া সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশকে তাহারা ঢাকিয়া দেয় অনাস্থার চাদরে। প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীর উপর দমনপীড়ন চালাইয়া তাহারা যেই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, তাহারই সার্বিক ফলস্বরূপ নির্বাচনব্যবস্থা জনগণের আস্থাহীনতার শিকারে পরিণত হইয়া উঠে। আস্থা এইখানে যেন বালির বাঁধের ন্যায়! অর্থাত্ যত কথাই বলা হউক না কেন, উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনব্যবস্থায় আস্থাহীনতার ‘ফুল অ্যান্ড ফাইনাল’ কারণ ইহাই।

সদ্য সমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন লইয়া দেশে-বিদেশে আলোচনা-সমালোচনার অন্ত নাই। নির্বাচন কতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হইল, বিতর্কের ঊর্ধ্বে নাই তাহাও। নির্বাচন পরিচালনায় যিনি মূল দায়িত্বে ছিলেন, স্বয়ং তিনিই বলিতেছেন, ‘এই নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে যাইতে পারে নাই। নির্বাচনের উপর আস্থা হারাইয়াছে জনগণ।’ প্রশ্ন হইল, আস্থা ছিল কোন কালে? কোন নির্বাচনের সময়? বরং এই জনপদে কোনো নির্বাচনই ‘গণ-আস্থা’ অর্জন করিতে পারে নাই বলিলে কি ভুল বলা হইবে? এই ধরনের ‘আশঙ্কাজনক বাস্তবতা’ জানিবার পরও সচেতন অনেকেই আগাইয়া আসেন রাষ্ট্রীয় নির্বাচনি ধারা ও সংস্কৃতি চলমান রাখিবার প্রশ্নে। তাহারা অগাধ বিশ্বাস লইয়া আগাইয়া আসেন, তাহাও কিন্তু নহে! এক পায়ের উপর ভরসা করিয়া অন্য পা সামনে বাড়াইবার ন্যায় পরিস্থিতি যেই হেতু এই সকল ভূখণ্ডে অনুপস্থিত, সেই অবস্থায় ভবিতব্য জানিবার পরও আগাইয়া আসিতে হয় বটে। তবে দিন শেষে শুনিতে পাওয়া যায় নানা গোপন এজেন্ডার কথা, গোপন পরিকল্পনার গল্প। এইরূপ পরিপ্রেক্ষিতে অনাস্থাই অধিক দৃশ্যমান হইয়া উঠে। এহেন প্রেক্ষাপটে যখন আস্থাহীনতার কথা উঠে, তখন বলিতেই হয়—যেই জিনিস ছিলই না, তাহা লইয়া হা-হুতাশ করিবার কী আছে? উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রায় সকল কিছুই দরদাম দিয়া পরিমাপ করা হয়, ‘মূল্য’ কী জিনিস, তাহা বুঝিবার চেষ্টা করা হয় না। সেই অর্থে, নির্বাচন সুষ্ঠু হইল কি হইল না, তাহার সুরাহা দুর্বোধ্য!

উন্নয়নশীল বিশ্বে ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যে সর্বদাই একধনের ‘ভয়’ কাজ করিয়া থাকে। ইহার ফলে নির্বাচনের সময় শক্ত প্রতিপক্ষকে মাঠের বাহিরে রাখিয়া তুলনামূলক ছোট দলগুলিকে নির্বাচনে আনিয়া নির্বাচনি ধারা সমুন্নত রাখিবার চেষ্টা চলে; কিন্তু এইখানেও চলে ‘ঠান্ডা মাথার খেলা’! আড়াল হইতে কলকাঠি নাড়েন দলের মধ্যে ঘাপটি মারিয়া থাকা একশ্রেণির নেতা বা আমলা। তাহাদের কলাকৌশলে বিভিন্ন নামধারী নেতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতার চেয়ার পাইয়া যায়, যাহাদের কারণেই ঘটে অনাস্থা। ‘জনগণ কখনোই এতটা মিথ্যার শিকারে পরিণত হয় না, যতটা হাইয়া থাকে যুদ্ধের সময় এবং নির্বাচনের পূর্বে’—অটো ফন বিসমার্কের এই কথাই উন্নয়নশীল বিশ্বের নিয়তি। সুতরাং, আস্থাহীনতা উন্নয়নশীল বিশ্বের একেবারে শেকড় অবধি বিচরণ করিতেছে বলিতে হয়।

এইবারের নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, পক্ষপাতদৃষ্টহীন হইয়াছে, সেই প্রসঙ্গে না গিয়া বরং প্রশ্ন উঠিতে পারে, এই সংস্কৃতির শেষ কোথায়? আস্থার জায়গা তৈরি হইতেই-বা আর কত সময় লাগিবে? নির্বাচন লইয়া জনগণের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে যেই অবিশ্বাস, অনাস্থা বিরাজমান, তাহা কীভাবে দূর হইবে? পরিস্থিতির উত্তরণে আনফিনিশড রেভল্যুশনের প্রসঙ্গ টানেন কেহ কেহ। ইহাই কি শেষ কথা? যেইভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের লালন-পালন করিয়া হূষ্টপুষ্ট করা হইতেছে, তাহাতে গণ-অসন্তোষ বৃদ্ধির পাশাপাশি আস্থাহীনতা বাড়িতেই থাকিবে। সুতরাং, যেই আস্থা ছিলই না, যাহা নাই এবং যাহা প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা হইতেছে না, তাহা লইয়া আলোচনা অবান্তর বই আর কিছুই নহে।

ইত্তেফাক/এএইচপি