প্রবীণের জন্য আলাদা কোনো উৎসব নেই। সবার সঙ্গে উৎসবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেলে খানিকটা আনন্দফুর্তি, হইচই করে নিজেদের চাঙ্গা করতে পারেন। প্রবীণরা উৎসবে অংশ নিতে চান। পরিবার পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো প্রাণে শক্তি জোগায়। নিঃসঙ্গ প্রবীণের প্রতিটি মুহূর্ত অনেক সময় কষ্ট ও ব্যথা-বেদনার। বেশির ভাগ প্রবীণ ধর্মপালনে অধিক মনোযোগী হয়ে নিঃসঙ্গতা কাটাতে চান। পরকালের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমাদের প্রতিটি উৎসবই তরুণ প্রজন্মকে গুরুত্ব দিয়ে উদ্যাপিত হয়। উৎসব সাজানোর সময় প্রবীণদের কথা তেমন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় না। উৎসবে সব বয়সি মানুষের অংশগ্রহণ সহজ করা খুবই জরুরি বিষয়। প্রতিবন্ধী মানুষ আনন্দ উৎসবে শামিল হলে উৎসব বৈচিত্র্যপূর্ণ হবে।
আমাদের দেশে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উৎসব হলো পিকনিক বা বনভোজন। বিশেষ করে, শীতের সময় এই আয়োজনটা সবচেয়ে বেশি করা হয়। পরিবার পরিজন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন দল বেঁধে দর্শনীয় স্থান বা রিসোর্টে সারা দিন মুখরোচক খাবার, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাফেল ড্র ইত্যাদি আয়োজন করে। এসব আয়োজনে প্রবীণের দুর্বল অংশগ্রহণ থাকে কিংবা মোটেও থাকে না। পিকনিকে প্রবীণদের জন্য আলাদা করে কোনো আয়োজন তেমন একটা চোখে পড়ে না। আয়োজকরা ভুলে যান যে, পিকনিকে প্রবীণরাও আসেন।
গায়ে হলুদ, বিয়ে, বউভাত, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, পুনর্মিলনীতে আমাদের প্রবীণরা অংশগ্রহণ করে থাকেন। এই উৎসবগুলোতে যেসব আয়োজন থাকে, তাতে অংশগ্রহণ করতে টাকাপয়সা খরচ হয়। অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রবীণরা উৎসবে যোগ দিতে আগ্রহী হন না।
সাহিত্য সম্মেলন, কবিতা উৎসব, কনসার্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, নাটক, সিনেমায় প্রবীণদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রবীণরা প্রভূত আনন্দ লাভ করেন। উৎসবে অংশগ্রহণ সহজ স্বাভাবিক আনন্দদায়ক করতে আয়োজকরা সব সময়ই সচেতন থাকেন। এখন সময় এসেছে, প্রবীণদের উৎসবে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে তোলা। উৎসবকে প্রবীণবান্ধব করে আয়োজন করা প্রয়োজন। খাওয়াদাওয়া উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ফলে খাবার প্রবীণবান্ধব হওয়া দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবীণরা হাসিখুশি, আনন্দে থাকলে তাদের অসুখবিসুখ তুলনামূলকভাবে কম হবে। আমাদের দায়িত্ব হবে প্রবীণদের সামাজিক অনুষ্ঠানে এবং উৎসবে অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করা।
সামাজিক পরিবর্তনের ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে স্বামী-স্ত্রীকেন্দ্রিক একক পরিবারের উত্পত্তি হয়েছিল। সেই একক পরিবারও নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। নারীরা ব্যাপকভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের কারণে স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থল আলাদা হয়ে গেছে। প্রায় ১ কোটি কর্মজীবী মানুষ বিদেশে অবস্থান করায় স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে প্রবীণদের পরিবারে দেখাশোনা, সেবাযত্ন পাওয়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। বিপুলসংখ্যক প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে হলে উৎসবের বিকল্প নেই। মানুষ সমাজে বাঁচতে চায়, সামাজিক জীবনই কাম্য। অস্তগামী সূর্য ডোবার সময় পশ্চিম আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে। সূর্য ডোবার দৃশ্য উপভোগ করার জন্য হাজার হাজার মানুষ উদ্গ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে। তেমনি মানুষের জীবনের শেষের দিনগুলো রঙিন করে সাজিয়ে নিতে হবে, যা দেখে অন্যরা আনন্দ লাভ করবে। ব্যক্তি নিজেও জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে, আনন্দিত হবে। জীবনকে উদ্যাপিত করতে হবে। জীবন শুধু অনুশোচনা, নালিশ, দুঃখদুর্দশা কষ্ট ভোগের জন্য নয়। প্রবীণ জীবনে বেশির ভাগ মানুষ পরিপূর্ণতায় থাকে। স্বাধীন জীবনযাপন করার সুযোগ আসে। দায়দায়িত্ব তুলনামূলকভাবে কমে আসে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে দুঃখকষ্ট, ব্যথা বেদনা কমবেশি রয়েছে। সেই দুঃখকষ্ট প্রবীণ বয়সে বারবার মনে করে কষ্ট পাওয়ার কোনো মানে হয় না। দুঃখের কাহিনি বারবার মনে করে ভারাক্রান্ত হয়ে লাভ নেই। দুঃখ কষ্ট মোকাবিলা করতে হবে আনন্দ লাভ করে। আনন্দ পেতে এবং আনন্দ দিতে ব্যক্তির বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। প্রবীণকেই আনন্দ লাভের জন্য উদ্যোগী হতে হবে।
আমরা উপরিউক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রবীণদের জন্য প্রবীণ উৎসবের আয়োজন করেছি। ১৫০ জন প্রবীণ ঢাকার ধানমন্ডি সোবহানবাগের একটি রেস্তোরাঁয় আজ মিলিত হব। আমরা চাই, গ্রামে গঞ্জে, শহর বন্দরে বিবেচনাসম্পন্ন মানুষরা প্রবীণবান্ধব নানান রকমের উৎসবের আয়োজন করুক। যাতে করে প্রবীণরা সহজে এই ধরনের উৎসবে যোগ দিয়ে পরিচিত, জানাশোনা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সান্নিধ্য লাভ করতে পারে। প্রবীণ উৎসব হোক জীবনের জয়গান।
লেখক: প্রবীণ বিষয়ে লেখক, গবেষক ও সংগঠক
