সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

ভাঙিতে হইবে এই যুদ্ধ-শৃঙ্খল

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

শরীরো কোথাও যখন সারাক্ষণ যন্ত্রণা চলিতে থাকে, তখন প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হইলেও একটা সময় আসিয়া কষ্ট-যন্ত্রণা যেন অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হইয়া যায়। সারা বিশ্বের অবস্থাও তেমনই। একবিংশ শতকের শুরু হইতেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাবস্থা চলিতেছিল। সমুদ্রের জোয়ারভাটার মতো তাহা সাময়িক সময়ের জন্য উঠানামা করিয়াছে মাত্র, শেষ আর হয় নাই। এখন দিকে দিকে যুদ্ধ, সংঘর্ষ, সংঘাত, ক্ষয়ক্ষতির নূতন নূতন ক্ষেত্র তৈরি হইতেছে। এই যুদ্ধ-সংঘাতের হাত ধরিয়াই চলিতেছে বড় ধরনের মানবিক সংকট। গাজায় যাহা হইতেছে তাহাকে এক কথায় বলা যায়—বিশ্বের মোড়লদের সম্মিলিত শক্তি যেন ঠাসিয়া ধরিয়া গাজার মানবতাকে জবাই করিতেছে। খাদ্য নাই, ঔষধ সরববাহের পথ রুদ্ধ, শিশুসহ অযুত নিরীহ মানুষ হত্যা! যুদ্ধের নির্মম বলি কেন হইবে নিষ্পাপ শিশুরা?

রাশিয়া-ইউক্রেনে যাহা চলিতেছে, তাহা কবে থামিবে? সম্প্রতি নামকরা জার্মান পত্রিকা বিল্ডে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হইয়াছে—রাশিয়া সামরিক জোট ন্যাটোর মিত্র দেশগুলিতে আক্রমণ করিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ আরো প্রসারিত করিতে পারে। আর ইহার মাধ্যমে শুরু হইতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও। বিল্ড বলিতেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নিজেদের প্রোপাগান্ডা এবং আরো সহিংসতাকে ইন্ধন দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করিতে পারে রাশিয়া। যুদ্ধ-সংঘাতে বিশ্বব্যাপী অথনৈতিক অস্থিরতাও কমিতেছে না সহজে। ২০২৩ সালের মতো ২০২৪ সালেও নিরাপত্তা হইতে যাইতেছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে অর্থনৈতিক যেই অনিশ্চয়তা শুরু হইয়াছিল এবং প্রবাহিত হইয়াছিল ২০২৩ সালে ইসরায়েল-হামাস সংঘর্ষের দিকে, তাহা ২০২৪ সালেও অব্যাহত থাকিত বলিয়া বিশ্লেষকেরা মনে করিতেছেন। যদি এইভাবে শান্তি অধরা থাকে, তাহা হইলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও মন্দা প্রলম্বিত হইবে। ইতিপূর্বে তৈল, খাদ্য ও সারের অনিশ্চয়তা অন্যান্য পণ্যের উপর প্রভাব ফেলিবে এবং বিশ্ব জুড়ে মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করিয়াছে। বর্তমানে কিছু দেশে, যেমন—তুরস্ক (৮৬ শতাংশ), ইরান (৪০ শতাংশ) ও পাকিস্তানে (২৯ শতাংশ) মূল্যস্ফীতি ভয়ংকর জায়গায় চলিয়া গিয়াছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশেও মূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকিতেছে না। বাংলাদেশে সম্প্রতি পরিচালিত একটি জরিপে জানা গিয়াছে, গত বত্সর ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ী জানাইয়াছেন তাহাদের ব্যবসা ভালো চলিতেছে না। উত্পাদন ও বিপণন কমিয়াছে। তাত্পর্যপূর্ণ তথ্য হইল, মাত্র ৬ শতাংশ ব্যবসায়ী বলিয়াছেন, আগের অর্থবত্সরের তুলনায় তাহারা ভালো করিয়াছেন।

এই দিকে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির এবং বিশেষ করিয়া তৈলের মূল্যের অস্থিরতার পাশাপাশি সুদের হার বাড়িবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাহার নীতিগত হারকে উচ্চ (এখন ৫.৫ শতাংশ) রাখিতেছে। ফলে অন্য দেশগুলিরও সুদের হার চাপের মধ্যে রহিয়াছে। যাহাদের মূল্যস্ফীতি অধিক, তাহাদের সুদের হার, যেমন—তুরস্কে ৩০ শতাংশ, পাকিস্তানে ২২ শতাংশ এবং ইরানে ১৮ শতাংশে উঠিয়া গিয়াছে। কারণ, মূল্যস্ফীতির অনিশ্চয়তা সুদের হারের অস্থিরতাকে প্রভাবিত করিয়া থাকে। ইহা ব্যবসার ক্ষমতার উপর চাপ সৃষ্টি করে, বিশেষ করিয়া ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তরা বিপদে পড়েন।

সার্বিকভাবে আমরা দেখিতে পাইতেছি, নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের আন্তঃদেশীয় প্রক্রিয়ার সহিত পণ্য, কোম্পানি এবং দেশগুলির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা গত বত্সর একটি জটিল খেলায় পরিণত হইয়াছিল। এই বত্সরও তাহা আরো জটিল হইবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগও বৃদ্ধি পাইতেছে। অধিক বৃষ্টি, অধিক বন্যা-ধস, খরা, হিটওয়েভ, ভূমিকম্প-ঝড়—সকল মিলাইয়া যেন বৈশ্বিক টালমাটাল অবস্থার উন্নয়ন দেখা যাইতেছে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘যুদ্ধ যখন বাধিল অচলে চঞ্চলে/ ঝঙ্কারধ্বনি রণিল কঠিন শৃঙ্খলে’। আমাদের, বিশ্ববাসীর ভাঙিতে হইবে এই যুদ্ধ-শৃঙ্খল। নচেত্ আমরা সকল দিক দিয়াই বিপর্যস্ত হইতে থাকিব।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন