সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

তাহাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের এখনই সময়

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩০

দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো চলিতেছে নির্বাচনোত্তর সহিংসতা। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর অত্যাচার-নির্যাতনের পাশাপাশি বিপক্ষ নেতাকর্মীদের উপর বর্বরোচিত হামলা, গুরুতর জখম, হত্যা, বসতবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ঘটনা বন্ধ হইতেছে না। দক্ষিণাঞ্চলে নৌকার সমর্থক এক কর্মীকে হত্যার উদ্দেশ্যে দুই চক্ষু উপড়াইয়া ফেলিবার চেষ্টাসহ হাত ও পায়ের রগ কর্তন করিয়া উপর্যুপরি গুরুতর আহত করিবার ঘটনাও ঘটিয়াছে। অনুসন্ধান করিলে দেখা যাইবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহার সহিত জড়িত রহিয়াছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে তাহাদের ঘাপটি মারিয়া থাকিবার বিষয়টি ইতিপূর্বে আমরা বহুবার উল্লেখ করিয়াছি। অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও পেশিশক্তির বলে তাহারা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদপদবি দখল করিয়া বসিয়া আছে। মাদক কারবারসহ হেন অপকর্ম নাই যাহা তাহারা করিতেছে না। তাহারা স্থানীয় প্রশাসনকে তাহাদের অর্জিত অবৈধ অর্থের মাধ্যমে কবজা করিয়া ফেলিয়াছে। তাহারা এমন সকল অন্যায়-অপকর্ম করিয়া চলিয়াছে যাহাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

ক্ষমতাসীন দলের অনেকে প্রায়শ বলিয়া থাকেন যে, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও তাহাদের উত্তরসূরিদের প্রতিহত করা হইবে; কিন্তু তাহাদের মতাদর্শীরাই যখন তাহাদের দল ও সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এমনকি স্পর্শকাতর জায়গায় বহাল তবিয়তে থাকেন, এমনকি প্রভাব বিস্তার করিয়া চলেন, তখন এই কথার মর্ম কী, তাহা অনেকের নিকট বোধগম্য নহে। তাহারা যতদিন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকিয়া কলকাঠি নাড়িবেন, ততদিন এমন অস্থিরতা হইতে পরিত্রাণ লাভ করা যাইবে না এবং এমন সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনার বিস্তার ঘটিতেই থাকিবে। কেননা তাহারা অনুপ্রবেশকারী এবং তাহাদের কাজই হইল আত্মঘাতীমূলক। তাহাদের কেহ কেহ এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জয়লাভও করিয়াছেন; কিন্তু নির্বাচনের পর বিজয় মিছিল করা কিংবা কোনো প্রকার সহিংসতার আশ্রয় লইবার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের পক্ষ হইতে বারংবার সতর্কবার্তা দেওয়া হইলেও সেইদিকে তাহাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। কথায় বলে, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। তাহারা যে বর্ণচোরা তাহা আজ দিবালোকের মতো প্রতিভাত হইয়া উঠিয়াছে।

সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক প্রথম দিকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল হইতে বহিষ্কারের কথা বলিয়াছিলেন। দলের সিদ্ধান্তের বাহিরে গিয়া কেহ নির্বাচনে প্রার্থী হইতে পারিবেন না বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছিলেন; কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচনে কয়েকটি বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করিলে এই কৌশল পরিবর্তিত হইয়া যায়। তখন এই সকল স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রতি শুধু নমনীয় আচরণ করা হয় নাই, বরং নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামুখর দেখাইতে অবশেষে তাহাদের নির্বাচনে দাঁড়াইবার ব্যাপারে উত্সাহিত করা হয়। নির্বিচারে এমন সিদ্ধান্ত লইবার কারণে অনুপ্রবেশকারীদের জন্য তৈরি হয় এক মহাসুযোগ। দুই হস্তে অর্থ খরচ করিয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করিয়া কেহ কেহ নির্বাচনি বৈতরণি পার হইয়া যায়। এখন নির্বাচনোত্তর যে অস্থিরতা বিরাজ করিতেছে, তাহাতে এই চক্রের উসকানিকে অস্বীকার করা যায় না। আমরা মনে করি, এইখানে অন্য আরেকটি শক্তি কাজ করিতেছে। তাই এই ব্যাপারে আমাদের সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নাই।

তাহারা যেই সকল অপকর্ম চালাইতেছে তাহাতে দেখা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহারা ১৪ দলের জোটভুক্ত নেতাকর্মীদের উপর ন্যক্কারজনকভাবে হামলা চালাইতেছে। মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলায় তাহাদের জেলে পুরিয়া রাখা হইতেছে মাসের পর মাস। তাহাদের সন্ত্রাস ও হুমকি-ধমকির কারণে অনেকে ঘরে থাকিতে পারিতেছেন না। দেশান্তরী হইবার ঘটনাও ঘটিতেছে। ইহাতে এই সকল এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে। এই সকল ঘটনার এখনই প্রতিকার করা না হইলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যাইতে পারে। বিশেষ করিয়া যাহারা স্বাধীনতাবিরোধী ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে থাকিয়া নানা কুকর্ম করিয়া যাইতেছে, তাহাদের ব্যাপারে সকল প্রকার সতর্কতা অবলম্বন করিবার এখনই সময়। কথায় বলে, সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। তখন হয়তো কিছুই করিবার থাকিবে না।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন